ফেরাল ক্যাট বা বন্য বিড়ালের বৃত্তান্ত

ফেরাল ক্যাট বা বন্য বিড়ালের বৃত্তান্ত

সম্প্রতি প্রথম আলোর ফেইসবুক পেইজ থেকে এক ছবি প্রচার করা হয় যেখানে দেখা যায় এক বিড়াল এক কাঠবিড়ালির টুঁটি চেপে ধরে আছে। ছবিটি বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গন থেকে তোলা হয়। ছবিটির নিচে অনেকেই অনেক কমেন্ট করেছে। কেউ এখানে ফটগ্রাফারের দায়িত্বহীনতার (!) সমালোচনা করছে কেউ আবার বিড়ালের খাবার বিড়াল খেয়েছে তাতে ফটোগ্রাফারের কি করার আছে ইত্যাদি বিভিন্ন কমেন্ট করছে। আসলে বিষয়টা কি ?

ফেরাল ক্যাট বা বন্য বিড়াল এই নামটির সাথে আমরা বাংলাদেশীরা এখনো ওরকম পরিচিত হয়ে উঠতে পারিনি। কিন্ত অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ডের মতন দেশের লোকেরা এ শব্দটির সাথে ব্যাপকভাবে পরিচিত। তবে তা আতঙ্ক হিসেবে। ফেরাল ক্যাট বা বিড়াল এ শব্দটা শুনলে প্রথমে মনে হতে পারে এটা হয়তবা বিড়ালেরই ভিন্ন কোন প্রজাতি। যেমনঃ বিড়ালের এক প্রজাতি হল রয়েল বেঙ্গল টাইগার, আরেক প্রজাতি বাঘ , এছাড়াও আরো ছোট সাইজের বিড়াল যেমনঃ মার্বেল ক্যটা, লেওপার্ড ক্যাট, ফিশিং ক্যাট প্রভৃতি। অনেকেই মনে করতে পারেন ফেরাল ক্যাটও ওরকম কিছুই একটা। কিন্ত বাস্তবতা সম্পন্ন ভিন্ন।

ফেরাল ক্যাটমূলত ঐ বিড়ালদের বুঝায় যে বিড়াল আমাদের ঘর বাড়িতে আশ্রিত হওয়ার কথা ছিল কিন্ত কোন কারণে তারা ঘরের বাহিরে থেকেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে এবং তারা মানুষ থেকে দূরে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এবং অন্যান্য বাসা বাড়ির বিড়ালের মত কারো দ্বারা আদর বা স্পর্শ হওয়া পছন্দ করে না তাকেই ফেরাল ক্যাট হিসেবে জীববিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করেন। যেহেতু তারা বাহিরে থাকতেই অভ্যস্ত তাই স্বাভাবিক হিসেবেই তারা ঘরের খাবার খায় না। তারা বাহিরের খাবার খেতেই অভ্যস্ত হয়ে যায়। বাহিরের খাবার বলতে তারা অন্যান্য বন্যপ্রানীর মতই পাখি, কাঠবিড়ালি, সাপ, গিরগিটি ইত্যাদি শিকার করে খেতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তারা পুরোদস্তর শিকারী হয়ে যায়। তাদের আচরণ অনেকটাই অন্যান্য বন্য বিড়ালদের মত হয়ে যায়।

ফেরাল ক্যাটসম্পন্নভাবে ইকোসিস্টেমের বাহিরের এক অংশ। ইকোসিস্টেমের বাহিরের কোন জিনিস যখন কোন সুশৃঙ্খল বা হাজার বছর ধরে চালু থাকা কোন ইকোসিস্টেমের ভিতর প্রবেশ করে তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই ইকোসিস্টেম ভেঙ্গে পড়ে। যে খাবার অন্যান্য বন্য প্রাণীর ছিল সেই খাবার এখন বিড়ালের। খাদ্য নিয়ে প্রতিযোগিতা বেড়ে যায়। অনেক প্রাণীর জন্যই তখন টিকে থাকতে অসাধ্য হয়ে পড়ে। ফেরাল ক্যাট বা বিড়াল দ্বারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে আইল্যান্ড বা দ্বীপ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো। সেখানকার ইকোসিস্টেম ফেরাল ক্যাটের জন্য এক রকম ভেঙ্গে পড়ছে। বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীদের ফেরাল ক্যাট থেকে রক্ষার জন্য আলাদা করে কনজারভেশন সিস্টেম খুলতে হচ্ছে। ৩৩ প্রজাতির প্রাণীর বিলুপ্তির পিছনে ফেরাল ক্যাট কে দায়ী করা হয়। এক রিসার্চপেপারে আমেরিকার ওয়াইল্ডলাইফ বায়োলজিস্টরা দাবি করে ফেরাল ক্যাট আমেরিকার বন্যপ্রাণীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। তারা একটা ডেটা উপস্থাপন করে যে প্রতি বছর ফেরাল ক্যাট দ্বারা কমপক্ষে ১.৪ বিলিয়ন থেকে ৩.৭ বিলিয়ন পাখি এবং ৬.৯ বিলিয়ন থেকে ২০.৭ বিলিয়ন স্তন্যপায়ী প্রাণী নিহত হয় []

ফেরাল ক্যাটের কাছে ঐ সমস্ত অঞ্চলের বন্যপ্রাণীরা খুবই নাজুক বিশেষ করে যাদের পূর্বপ্রজন্মের কখনোই বিড়ালের মত কোন প্রাণীর সাথে সহাবস্থান হয় নি। যেমনঃ নিউজিল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়া বা ক্যারিবিয়ান আইল্যান্ডের বন্য প্রাণীরা। অবস্থা এরকম দাড়িয়েছে যে অস্ট্রেলিয়ার প্রাণীরা নিজ ভূমির শিকারী প্রাণীদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার থেকে বিশ গুন বেশি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ফেরাল ক্যাট দ্বারা। অর্থাৎ ফেরাল ক্যাটের বিষয়টি মোটেও মামুলি কোন বিষয় নয়। অস্ট্রেলিয়াতে বিলিয়নের উপর পশু পাখি নিহত হচ্ছে শুধুমাত্র ফেরাল ক্যাট দ্বারা । এই সংক্রান্ত অস্ট্রেলিয়ান ওয়াইল্ডলাইফ বায়োলজিস্টদের রিসার্চ পেপারে বিভিন্ন ডেটা উপস্থাপন করা হয় সেখানে উল্লেখ করা হয় যে , প্রতি বছর কমপক্ষে দুই বিলিয়ন প্রাণী ফেরাল ক্যাট দ্বারা নিহত হয় । পঁচিশ রকমের স্তন্যপায়ী প্রাণীর বিলুপ্তি হয়েছে। এবং আরো ১২৪ প্রজাতির প্রাণী বিপন্নগ্রস্ত শুধুমাত্র ফেরাল ক্যাটের কারণে। এছাড়াও প্রতি বছর অস্ট্রেলিয়াতে ২৩০ মিলিয়ন পাখি, সরীসৃপ এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণী ফেরাল ক্যাট দ্বারা নিহত হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়াতে ফেরাল ক্যাটের সংখ্যা এতই বেশি যে প্রত বর্গ কিলোমিটারের জন্য নয়টা বিড়াল ! অর্থাৎ বুঝাই যাচ্ছে ওখানকার বন্যপ্রাণীরা কি পরিমাণ নাযুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে। যে জিনিস এদের পূর্বপুরুষের কেউ কখনো দেখেনি। হঠাৎ করে তাদের নতুন এক আপদের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। আরো সমস্যা হল অস্ট্রেলিয়া আবহাওয়াগতভাবে একেক জায়গায় একেক রকম ফেরাল ক্যাট সব পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। বিড়াল অতি সহজেই নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে কিন্ত যা বিড়ালের জন্য ভালো হলেও নেটিভ বন্যপ্রাণীর জন্য তা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়াচ্ছে []

 

লাখ লাখ বিড়াল নিয়ে অস্ট্রেলিয়া এক অস্বস্তির মধ্যে পড়েছে। তারা এই বিড়ালদের মারার জন্য আলাদাভাবে শুটার নিয়োগ করছে []। বিষয়টা হঠাৎ করে কারো সামনে আসলে অনেক খারাপ কিছু মনে হতে পারে কিন্ত ইকোসিস্টেম টিকিয়ে রাখতে হলে বায়োলজিস্টদের নিকট এর থেকে আপাতত ভালো কোন উপায় নেই।

ফেরাল ক্যাটের সমস্যা আরো ভালোভাবে বুঝানোর জন্য নিউজিল্যান্ডের টিয়া পাখি কাকাপোএর প্রসঙ্গ তুলে ধরছি। কাকাপো পৃথিবীর সবচেয়ে মোটা এবং ভারী প্যারট বা টিয়া পাখি। এরা ভারী হওয়ার জন্য এরা উড়তেও সক্ষম নয়। কিন্ত এদের হাজার বছর ধরে টিকে থাকার জন্য এ উড়তে না পারাটা কখনো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় নি। কেননা নিউজিল্যান্ডে কোন ল্যান্ড বা ভূমির শিকারী প্রাণী ছিল না। কিন্ত নিউজিল্যান্ডে যখন মানুষ তার নিবাস গড়তে থাকে তখন তাদের সঙ্গে করে নিয়ে আসা বিড়াল এই পাখিদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একেতো তারা উড়তে জানে না তারপরে বিড়ালের মত শিকারী প্রাণীর বিরুদ্ধে তাদের কোন আত্মরক্ষার কোন ব্যবস্থাও নেই। ফলশ্রুতিতে এ পাখি এবং পাখির ডিম বিড়াল দ্বারা ব্যাপক আকারে শিকার হতে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে নিউজিল্যান্ড সরকার এক সময় কাকাপো কে বন থেকে উঠিয়ে নিয়ে কনজারভেশন সেন্টারে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। কেননা আরো কিছুদিন পাখিকে নিজের ভাগ্যের কাছে ছেড়ে দিলে অচিরেই বিলুপ্তির সম্মুখীন হবে। নিউজিল্যান্ড সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে ২.৫ মিলিয়ন ফেরাল ক্যাট কে হত্যার টার্গেট নিয়েছে []

ঠিক একইভাবে বেশিরভাগ বন্যপ্রাণীরই বিড়াল সম্পর্কে অজ্ঞ। তাদের শিকারের ধরণ, তাদের শিকারের সময় সবকিছুই অজানা। যেহেতু হাউজ ক্যাট কখনোই বন্য পরিবেশে ছিল না। তাই তারা এদের নিকট অতি সহজেই নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে।

ফেরাল ক্যাটের ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে। ফেরাল ক্যাট শিকারে অত্যন্ত দক্ষ হয়। আমরা যেসমস্ত প্রাণী কে দেখতাম তারা চোখের পলকেই হাওয়া যায় ফেরাল ক্যাটের নিকট সেগুলো শিকার করা যেন মামুলি কোন ব্যাপার। অসংখ্য আর্জিনাকে (Keeled grass skink) দেখতাম খুব তাড়াতাড়ি ফেরাল ক্যাটের কাছে ধরাশায়ী হয়ে যেত। আমি নিজেই গত বছর এক নিরীহ ডোরা বেত আঁচড়া ( bronzeback snake) সাপ কে মারাত্মক আহত অবস্থায় উদ্ধার করি।

একবার এক বড় মনস্টার সাইজ গুই সাপের পিছনে পিছনে গুইসাপের লেজ ফলো করে এক ফেরাল ক্যাটকেও যেতে দেখি। এরা যতটা না মানুষের উপস্থিতি পছন্দ করে তার থেকে বেশি পছন্দ করে নিরব ঝোপঝাড়। বাড়ির একেবারে যে জায়গাটা সবসময় নিরব হয়ে থাকে এবং পাখিদের কলকাকলিতে পরিপূর্ণ থাকে সে জায়গাগুলোই এদের পছন্দের জায়গা। এরা যেন সবসময় প্রস্তত থাকে শিকারের জন্য। বাংলাদেশে হয়তবা এখনো ফেরাল ক্যাট সামগ্রিকভাবে জীব বৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় নি কিন্ত আমরা যদি এখনো সাবধান না হই তাহলে অচিরেই তা সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে। তাই এটা ব্যাপকভাবে সমস্যার কারণ হয়ে দাড়ানোর আগেই আমাদের উচিত এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া। বিশেষ করে যারা তাদের বাসা বাড়িতে পালিত বিড়ালের বাচ্চা রাস্তাঘাটে ফেলে দিয়ে আসে সমূহ সম্ভাবনা আছে এরা একটা সময় ফেরাল ক্যাটে পরিণত হয়ে যেতে পারে।

তথ্যের উৎসঃ

[]https://www.nature.com/articles/ncomms2380

[২] https://www.publish.csiro.au/wr/WRv47n8_ED

[৩] https://www.nytimes.com/2019/04/25/magazine/australia-cat-killing.html

[৪] https://www.rnz.co.nz/news/national/297453/getting-rid-of-2-point-5m-feral-cats-by-2025

২ thoughts on “ফেরাল ক্যাট বা বন্য বিড়ালের বৃত্তান্ত

  1. ‘রক্তচোষা গিরগিটি’ আমার চোখে যে ‘সুপার লিজার্ড’ | WILDLIFE THINKER

    […] করে । আর এই সরীসৃপ হত্যা শুধুমাত্র যে ফেরাল বা বন্য বিড়াল দ্বারাই হয় ব্যাপারটা […]

  2. ‘ডিঙ্গো’ নিয়ে আবারো বিতর্ক | WILDLIFE THINKER

    […] গবেষণা করে দেখা যায় ডিঙ্গো খরগোশ, ঘরছাড়া বিড়াল ( ফেরাল ক্যাট) , তারপর ক্যাঙ্গারুর সংখ্যা নির্দিষ্ট […]

Leave a Reply

Your email address will not be published.