প্ল্যানেট আর্থ ‘টু’এর গালাপাগোস রেসার স্নেক এবং ইগুয়ানার ভাইরাল দৃশ্য ও এর পিছনের গল্প

প্ল্যানেট আর্থ ‘টু’এর গালাপাগোস রেসার স্নেক এবং ইগুয়ানার ভাইরাল দৃশ্য ও এর পিছনের গল্প

এই নভেম্বরে বিবিসির জনপ্রিয় ডকুমেন্টারি সিরিজ প্ল্যানেট আর্থ দুই (Planet Earth II ) এর পাঁচ বছর সম্পন্ন হল। এই সিরিজটি ছিল মূলত ২০০৬ সালে প্রচারিত হওয়া প্ল্যানেট আর্থের দ্বিতীয় সিরিজ। ২০১৬ সালের নভেম্বরের ছয় তারিখ বিবিসি ওয়ানে এর প্রথম পর্ব প্রচারিত হয়। প্রচারিত হওয়ার দিনেই এর প্রথম পর্বের একটি দৃশ্য বিশ্বব্যাপী ভাইরাল হয়ে পড়ে। যদিও পৃথিবীর তখনো অনেক লোকেরই মূল ডকুমেন্টারি দেখার সুযোগ হয় নি। কিন্ত সামাজিক মাধ্যম এবং ইন্টারনেটের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রথম পর্বের বিশেষ দৃশ্যটি এক রকম সবারই দেখা হয়ে যায়।

ভাইরাল দৃশ্যটি কি নিয়ে ছিল ?

যারা এখনো সেই দৃশ্যটির কথা মনে করতে পারছেন না তাদেরকে এখন মনে করিয়ে দিচ্ছি। দৃশ্যটি ছিল গালাপাগোস আইল্যান্ডে সদ্য ডিম ফুটে বের হওয়া মেরিন ইগুয়ানা কে (Marine Iguana ; Sci: Amblyrhynchus cristatus ) গালাপাগোস রেসার সাপের তাড়া করার শ্বাস্রুদ্ধকর দৃশ্য

অবশ্য সেই দৃশ্যকে শুধুমাত্র তাড়াকরা বললে বা চেজিংদৃশ্য হিসেবে সাব্যস্ত করলে ভুল হবে আসলে তা ছিল বাচা মরার লড়াই। এই বাচা মরার লড়াইয়ে সাপগুলো যেরকম আক্রমণ করে বসছিল একের পর এক ইগুয়ানা লিজার্ড কে যা সত্যিকারার্থেই অনেকের মনে সেদিন ভয়ের সঞ্চার করেছিল। তারপর শেষ দৃশ্যে যখন একটি বাচ্চা ইগুয়ানা নিজের ভাগ্যের জোড়ে সাপদের থেকে নিজেকে বাচাতে সক্ষম হয় তখন আমার মত হাজারো দর্শক যেন হাঁফ ছেড়ে বাচে। 

ভিডিওটি দেখতে ক্লিক করুন 

গালাপাগোস আইল্যান্ড কোথায়ঃ

গালাপাগোস আইল্যান্ড বা দ্বীপপুঞ্জ মূলত প্রশান্ত মহাসাগরে বেশকিছু আগ্নেয় দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এক দ্বীপপুঞ্জ। আন্তর্জাতিকভাবে এ দ্বীপের আরো অনেক নাম স্বীকৃত। স্প্যানিশ ভাষায় একে আইলস গালাপাগোস ( Isles Galapagos) বলা হয়।

প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব দিকে এ দ্বীপসমূহ অবস্থিত। এ দ্বীপ মূলত ইকুয়েডর রাষ্ট্রের অধিভুক্ত। এখানে মোট তেরটি বড় দ্বীপ যা আয়তনের সীমা হবে ১৪ থেকে ৪,৫৮৮ বর্গ কিলোমিটারের মত ।

এছাড়াও ছয়টি তুলনামূলক ছোট দ্বীপ এবং অসংখ্য পাথুরে দ্বীপ রয়েছে যা বিষম রেখার সাথে আড়াআড়িভাবে ৬০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। এর পশ্চিমে রয়েছে ইকুয়েডরের প্রধান ভূমি। সম্পন্ন ভূমির আয়তন হবে ৮,০১০ বর্গ কিলোমিটার। যা সমুদ্রে ৫৯,৫০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত।

এই দ্বীপ সমূহ এমন স্থানে বিস্তৃত যেখানে তিনটি সাগরের স্রোত বিদ্যমান। অর্থাৎ এখানকার সমুদ্রের পানিতে প্রচুর পুষ্টিকর উপাদান রয়েছে। যে কারণে এখানে অসংখ্য সামুদ্রিক জীবের সমাবেশ ঘটে। ইকুয়েডর সরকার ১৯৩৫ সালে গালাপাগোসের একটি অংশ কে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (Wildlife sanctuary) ঘোষণা করে যা ১৯৫৯ সালে গালাপাগোস জাতীয় উদ্যান ( National Park) করা হয়। ১৯৭৮ সালে ইউনেস্কো একে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে। গালাপাগোস আইল্যান্ড বহু পূর্ব থেকেই তার জীব বৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত। 

এজন্য শতাব্দী ধরে এখানে জীব গবেষকদের আনাগোনা রয়েছে। দীর্ঘ সময় ব্যাপী এ দ্বীপসমূহের বিচ্ছিন্নতার কারণে এখানকার জীব বৈচিত্র্য অনন্যভাবে গড়ে উঠে। যা যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞানীদের আলোচনার কেন্দ্র হয়ে আছে। এর মেরিন ইগুয়ানা একমাত্র সরীসৃপ যা নিজেদেরকে সাগরের তলদেশের  লতা আহরণে অভ্যস্ত করেছে। ১৮৩৫ সালে এ দ্বীপে চার্লস ডারউইন এসেছিলেন। এ দ্বীপ হতে তিনি অসংখ্য নমুনা সংগ্রহ করেন । এর জীব বৈচিত্র্য দেখে ডারউইনও খুব আশ্চর্য হন।

নতুন আইল্যান্ড হিসেবে এর বায়োডায়ভার্সাটি অন্যান্য আইল্যান্ডের তুলনায় অনেক সমৃদ্ধ । খুব সম্প্রতি ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট গালাপাগোসের জীব বৈচিত্র্য রক্ষায় এর মেরিন রিজার্ভ সংরক্ষিত এলাকা আরো ৬০,০০০ বর্গ কিলোমিটার বর্ধিত করেন। যা পূর্বে ছিল ১৩৩,০০০ বর্গ কিলোমিটার।

সেই সাপের পরিচয়ঃ

সেদিনের ভাইরাল দৃশ্যের পরে অনেকেই গালাপাগোসের এই রেসার সাপ সম্পর্কে জানতে চায়। তাদের জন্য এই সাপ নিয়ে বিস্তারিত এখানে তুলে ধরছি। ডকুমেন্টারির সাপটি মূলত রেসার সাপ হিসেবে পরিচিত। তবে এই নির্দিষ্ট প্রজাতির রেসার সাপকে (Pseudalsophis biserialis ) শুধুমাত্র গালাপাগোস দ্বীপসমূহেই পাওয়া যায়।

এজন্যই এদেরকে গালাপাগোস রেসার (Galapagos racer) হিসেবে পরিচয় করানো হয়। এরা মূলত কলুব্রিড (Colubride) গোত্রের । আমাদের দেশের বিভিন্ন বিষহীন বা মৃদু বিষযুক্ত সাপ মূলত এই গোত্রেরই সদস্য। গালাপাগোস রেসারের আবার দুটো উপ প্রজাতি রয়েছে। একটি হল পূর্বাঞ্চলীয় বা ইস্টার্ন রেসার (eastern racer) এবং অন্যটি হল পশ্চিমাঞ্চলীয় বা ওয়েস্টার্ন রেসার (western racer) সাপ। দের আসল উৎস স্থান এখনো ধোয়াশাপূর্ণ। সায়েন্টিস্টরা এখনো এটা নিয়ে গবেষণা করে চলেছেন যে গালাপোগাসে এই সাপের শুরু কিভাবে হল। তবে কাছাকাছি প্রজাতির সাপ বাহামা, কোস্টারিকা এবং সাউথ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া যায়। Drymobius, Liophis প্রজাতির সাপ গালাপাগোস রেসারের প্রায় কাছাকাছি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সাপ।

অনেকে মনে করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং সাউথ আমেরিকার সাপদের সাথে এদের খুব নিকট সম্পর্ক রয়েছে। হতে পারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং গালাপাগোসের সাপদের পূর্বপুরুষ সাউথ আমেরিকার সাপদের থেকে এসেছে অথবা এই তিন অঞ্চলের সাপদেরই এক পূর্বপুরুষ ছিল বিশেষ করে এই ভূমিসমূহ আলাদা হওয়ার পূর্বে i। তবে গালাপোগাসের সাপ সম্পর্কে এরকম ধারণা বহু পুরাতন।

ডারউইন গালাপাগোস দ্বীপ হতে যে সমস্ত জীবের নমুনা সংগ্রহ করেন তাদের মধ্যে একটি ছিল গালাপোগাস রেসারের নমুনা। যা ডারউইন সংগ্রহ করেছিল গালাপোগাস দ্বীপ্পুঞ্জের ফ্লোরিনা (Floreana) দ্বীপ হতে। বর্তমানে ফ্লোরিনা দ্বীপ হতে এই সাপ হারিয়ে গিয়েছে। যদিও অন্যদুটো দ্বীপে এই সাপের অস্তিত্ব এখনো রয়েছেখুব সম্প্রতি গবেষকেরা এর জেনেটিক্যালি সিকুয়েন্স বের করার জন্য আবেদন করে ii

ডি এন এ সিকুয়েন্সিং এর এই প্রস্তাবনা কার্যকর হলে এই সাপের আদি উৎসসহ অনেক অজানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই আমরা নিখুঁতভাবে অতি শীঘ্রই জানতে পারব বলে আশা করতে পারি। এই সাপ দৈর্ঘ্যে ১২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। গালাপোগাস রেসারদের স্যান ক্রিস্টোবাল আইল্যান্ডের সবখানে পাওয়া যায় । বিশেষ করে নিম্ন শুষ্ক ভূমি, বাগান, জঙ্গল, গুল্মভূমিসহ সমুদ্রতীরের পাথরি ভূমিতে এদের দেখা পাওয়া যায়। এছাড়াও উচ্চ ভূমি বিশেষ করে যেখানে আদ্রতার পরিমাণ অপেক্ষাকৃত বেশি সেখানেও এদের দেখা পাওয়া যায়।

এ সাপের শিকার কৌশলঃ

এই সাপ মূলত তার শিকারকে দম বন্ধ করে মেরে তারপর ভক্ষণ করে । অর্থাৎ পেষক (constrictor ) পদ্ধতি ব্যবহার করে যা অজগর অথবা বোয়া প্রজাতির সাপেরা  ব্যবহার করে থাকে।

তবে তারা তাদের নির্দিষ্ট শিকারের পিছনে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছুটতে পারে। সদ্য জন্মানো ইগুয়ানার পাশাপাশি এরা বিভিন্ন স্থানীয় গিরগিটি ( Lava lizard ) , টিকটিকি, পোকা, ইঁদুর সদ্য জন্মানো পাখির বাচ্চা ইত্যাদি প্রাণীও ভক্ষণ করে থাকে iiiএরা মৃদু বিষধর সাপ অর্থাৎ যা প্রাণঘাতী নয় ivঅর্থাৎ কোন প্রাণীকে ধরাশায়ী করার জন্য তারা তাদের মৃদু বিষ এবং পেষক পদ্ধতি উভয়ই ব্যবহার করে থাকে।

হুমকিঃ

এ সাপ ফ্লোরেনা আইল্যান্ড হতে ইতোমধ্যে বিলুপ্তির সম্মুখীন হয়েছে। মানুষের মাধ্যমে এই দ্বীপে বিভিন্ন সময় চলে আসা বিড়াল,ইঁদুর ইত্যাদি বাহিরের প্রাণীর কারণে ফ্লোরেনা দ্বীপ থেকে বিলুপ্ত হয়ে থাকতে পারে। যে সমস্ত দ্বীপে এই সাপেরা এখনো টিকে আছে সেখানে বাহিরের প্রাণীর সংখ্যা খুবই কম বা নেই বললেই চলে। সাপের পরিমাণ কমছে কিনা তা এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত নয়। আই ইউ সি এন (IUCN) তাদের রেড লিস্টে এ সাপকে  Near Threatened (NT) বা নিকট সংকটাপন্ন শ্রেণীতে তালিকাবদ্ধ করে । 

বিবিসির ধারণ করা শিকার দৃশ্যের মূল আকর্ষণ যেখানেঃ

এই ভিডিওটি করা হয়েছিল গালাপাগোসের ফারনান্ডিনা আইল্যান্ড (Fernandina Island)থেকে। এই ভিডিও  এমন এক সময় করা হয় যখন ছিল সাপেদের জন্য বছরের খাদ্যগ্রহণ বা খাদ্য পাওয়ার সবথেকে ভালো সময়। ইগুয়ানারা সাধারণত নিচে এসে যেখানে তারা তাদের ডিমের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা আছে বলে মনে করে সেখানে এসে তারা ডিম পেরে যায়।

ইগুয়ানার এরপর আর কোন দায়িত্ব থাকে না তার সন্তানের ব্যাপারে। এরপর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় সেই অপেক্ষায় থাকে রেসার সাপ। সাপ সাধারণত অতি দ্রুততার সাথে যেকোন নড়াচড়া নিরিখ করতে পারে। তাই ইগুয়ানার বাচ্চা ডিম ফুটে বের হওয়ার সাথে সাথে রেসার সাপ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ইগুয়ানা কে শিকার করার চেষ্টা করে। ইগুয়ানার টার্গেট থাকে সমতল ভূমি থেকে সড়ে উচু ভূমিতে গমন করা যেখানে বড় ইগুয়ানারা রয়েছে। এ দৃশ্যের মাঝে অনেকেই সাপকে ডেমোনাইজ  বা খারাপ রূপদান করার চেষ্টা করেছে । কিন্ত এটা বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়। প্রাণীজগত এভাবেই টিকে রয়েছে।

আর সদ্য ডিম ফুটে বের হওয়া ইগুয়ানা যে শুধুমাত্র রেসার স্নেকেরই খাবারে পরিণত হয় ব্যাপারটা এরকমও নয় । বিভিন্ন শিকারী পাখি যেমন গালাপাগোসের বাজপাখিও ইগুয়ানা নিয়মিত শিকার করে থাকে।  

ই দৃশ্যটি ভাইরাল হওয়ার কারণ কি ছিলঃ

নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ২০১৬ সালের এই ডকুমেন্টারির ব্যাপারে সবারই এক রকম অধীর আগ্রহ ছিল। অর্থাৎ প্রথম থেকেই অসংখ্য লোক এই ডকুমেন্টারি দেখার অপেক্ষাতে ছিল। এই সিরিজ প্রচারিত হওয়ার দশ বছর পূর্বে প্রচারিত হওয়া সিরিজ অর্থাৎ প্ল্যানেট আর্থ ( Planet earth) এখনো আই এম ডি বি ( IMDB)-র টপ টিভি শো এর দুই নাম্বারে রয়েছে যা এই দ্বিতীয় সিজন প্রচার হওয়ার আগ পর্যন্ত ছিল এক নাম্বারে তো স্বাভাবিক হিসেবেই এই সিজনের প্রতি মানুষের প্রচন্ড আগ্রহ থাকবে। এই সাপের দৃশ্যটি ভাইরাল হওয়ার পিছনে মানুষের আগ্রহ যে কাজ করেছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এরপর গালপাগোস রেসারের যে শিকারের দৃশ্যটি দেখানো হয় সাধারণত আমরা সাপের শিকারের এরকম কৌশল আগে কখনো প্রচারিত হতে দেখি নি যেখানে তাড়া করে শিকারের সাথে প্রতিযোগিতা করে দৌড়ের মাধ্যমে শিকার করা হয়। তারপর এখানে সিনেমাটোগ্রাফি করা হয়েছে এরকমভাবে যেন দর্শক মনে করে যে ইগুয়ানার বাচ্চাকে সব সাপ মিলে ধরেছে সেই শেষ পর্যন্ত তাদের থেকে নিস্তার পেয়ে নিজেকে রক্ষা করে। অর্থাৎ ঐ নির্দিষ্ট ইগুয়ানা হোক বা না হোক এখানে ন্যারেশনে কিছু নাটকীয় আবেগ প্রবেশ করানো হয় যা দর্শকদের মন কাড়ে।

অন্যদিক থেকে বৃটিশ ট্যাবলয়েড সমূহ এই দৃশ্য নিয়ে এই পর্ব প্রচারের পরেরদিন এমন কিছু শিরোনাম প্রদান করে খবর প্রচার করে যা সাধারণ মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করতে বাধ্য করেযেমনঃ বৃটিশ ট্যাবলয়েড মেট্রোর শিরোনাম যা বাংলা করলে দাঁড়ায় প্ল্যানেট আর্থ ২ এর সাপ এবং ইগুয়ানার মধ্যকার একেবারে পাশবিক দৃশ্য যা দর্শকদেরকে তাদের টিভির সামনে চিৎকার করতে বাধ্য করে। এরকম রংচটা শিরোনাম প্রায় ট্যবলয়েডই দেওয়া হয়। যেখানে রেসার সাপকে একরকম অপমানিত বা নিচু (Villified) করা হয়।

যেন সাপ তার খাবার খেয়ে অপরাধ করে ফেলেছে ! এখন পর্যন্ত এই ভিডিও অফিশিয়ালি যে চ্যানেলগুলো তাদের ইউ টিউব চ্যানেলে প্রচার করছে অর্থাৎ বিবিসি আর্থ ( BBC Earth), বিবিসি (BBC) , Zapping Sauvage এই তিনটা চ্যানেল মিলে প্রায় বিশ কোটি ভিউ হয়েছে। আর যদি টিভি তে প্রচার আমেরিকা ইউকে এবং এই চ্যানেলগুলোর ফেইসবুক চ্যানেলে প্রচার এবং বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে কপিরাইট লঙ্ঘন করে যেগুলো প্রচার করা হয়েছে সেগুলো যদি হিসেবে নেওয়া হয় তাহলে এই ভিডিওর ভিউ যেকোন ভাইরাল গানের ভিউ কে অনায়াসে ছাড়িয়ে যাবে। এটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। এই দৃশ্যটি নিয়ে আমেরিকার বহুল জনপ্রিয় লেট নাইট শো গুলোতেও অনেক আলোচনা হয়। এমনিক এই বছরের (২০২১) সিথ মায়ারের ( Seth Meyers) লেট নাইট শো এর এক পর্বেও এই ভিডিওটি প্রচার করা হয়। পাঁচ বছর হলেও এই ভিডিও তার আকর্ষণ হারায় নি। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এই দৃশ্যটি ভাইরাল হওয়ার জন্য পারফেক্ট ছিল।

দৃশ্যটি কি ভুয়া ছিল ?

বর্তমান ভি এফ এক্স (VFX) এর যুগে অত্যাশ্চর্য কিছু দেখলেই মনে হয় এখানে সফটওয়্যার এবং সবুজ পর্দার কোন কারসাজি আছে কিনা। কেননা এর থেকেও লোম দাঁড় করা দৃশ্য আমরা প্রায়ই সিনেমাতে দেখতে পাই। তাই সাপ ধাওয়া করছে ইগুয়ানা কে খুব দ্রুততার সাথে এই দৃশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। এটা হল দৃশ্য ফেইক বা ভুয়া বানানোর একটা উপায় । কিন্ত বিবিসি শুরুতেই এরকম ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্ত পরবর্তীতে আবার অভিযোগ আসে যে শুরু হতে যে ইগুয়ানা কে দেখানো হয়েছে অর্থাৎ যে ইগুয়ানাকে সব সাপ মিলে ধরে চক্রাকার বল বানানো শুরু করে এবং সে সেখান থেকে নিজেকে বাচিয়ে বের হয় আর যে ইগুয়ানা নিজেকে শেষ সময় পর্যন্ত নিজেকে বাচিয়ে পাথরের উপর উঠে যায় এরা ভিন্ন ভিন্ন ইগুয়ানা। শুধুমাত্র স্টোরিলাইনের জন্য বা অডিয়েন্স কে একটা গল্প উপহার দেওয়ার জন্য একটা দৃশ্য বানানো হয়েছে। এটা অবশ্য এই ডকুমেন্টারির প্রযোজক এলিজাবেথ হোয়াইট ( Elizabeth White) নিজেও ডেইলি মেইল কে এ কথা বলেছিলেন। অর্থাৎ বিভিন্ন ইগুয়ানা আর সাপের দৃশ্য নিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে। 

কিন্ত বিবিসি এটা কঠিনভাবে অস্বীকার করে। তারা বলে যে এই দৃশ্যে কোন জোড়া তালি লাগানো হয় নি। আমরা একটা ইগুয়ানাকেই ফলো করি। এই দৃশ্যটা ধারণ করতে দুটো ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। একটা সাপের জন্য এবং অন্যটা ইগুয়ানার জন্য ব্যবহার করা হয়। এবং যা মাঠে ধারণ করা হয়েছে তা আগে কখনো ধারণ করা হয় নি এবং কোন মানুষের নজরেও আসেনি। ন্যাচার ডকুমেন্টারির ইতিহাসে এটা এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা। এটা বিবিসির সম্পাদকীয় পলিসি অনুসরণ করেই ভিডিও ধারণ করা হয় এবং সম্পন্ন স্বাভাবিক আচরণ ধারণ করা হয়। বিবিসি থেকে এরকম রিপ্লাই জানানো হয়।

যদিও বিবিসির উপর এরকম ধারণা আসা অমূলক নয়। কেননা বিবিসির এর আগে হিউম্যান প্ল্যানেট ডকুমেন্টারিতে একটি মঞ্চায়িত ভিডিও ধারণ করে যা বিবিসি অনেক পরে স্বীকার করে। এছাড়া ব্লু প্ল্যানেট এ লবস্টারের একটা দৃশ্য দেখানো হয় যা আসলে ধারণ করা হয় ট্যাংক হতে কিন্ত সাধারণ দর্শক ধরে নেয় এটা সমুদ্র থেকে ধারণ করা । কিন্ত বিবিসি পরবর্তীতে স্বীকার করে এবং বলে পরিবেশ রক্ষায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ফ্রোজেন প্ল্যানেট এ মেরু ভাল্লুকের এক দৃশ্য দেখানো হয়েছিল যেটা নেওয়া হয়েছিল একটা চিড়িয়াখানা হতে। কিন্ত সাধারণ দর্শকের নিকট এই মেসেজ দেওয়া হয়েছিল যে এ দৃশ্য মূলত মেরুর বা আর্কটিকের vii। তাই এরকম প্রশ্ন আসা মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়।

কটা প্রশ্ন আসতে পারে যে সাপের দৃশ্য এত কাছ থেকে তোলা সম্ভব কি করে হল। ডেভিড অ্যাটেনবরো এ ব্যাপারে বিহাইন্ড দ্য সিন এ বলেন ফার্নান্ডিনাতে কোন মানুষ নেই। অর্থাৎ এখানকার বন্যপ্রাণী মানুষ সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ। তাই এখানকার বন্যপ্রাণী মানুষের অবস্থানের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত নাযুক নয় viii। এছাড়া BBC Earth Unpluged এর ইউটিউব চ্যানেলে এর উপর একটা বিহাইন্ড দ্য সিন ভিডিও আপ্লোড করা হয়। এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার ( Consulting Executive Producer) জনি কিলিং (Jonny Keeling) এর কিছু বক্তব্য তুলে ধরা হয় সেখানে দেখা যায় সেখানে দেখানো হয় ক্যামেরাম্যান ফ্রেডি এবং পল (Paul Stewart) রোনিন ক্যামেরা সেটিং করছে যা স্ট্যাবালাইজড অর্থাৎ ভালোভাবে সাপের রোলিং ভিডিও ধারণ করার জন্য যা যথেষ্ট। আর অপরদিকে ক্যামেরাম্যান রিচার্ড (Richard Wollocombe) এবং তার সহযোগি সায়ম এবং রবিকে পরিচয় করানো হয়। যারা লং লেন্স দিয়ে এই দৃশ্য তোলার জন্য প্রস্তত হচ্ছিল। অর্থাৎ দূর থেকে টাইট শট তারা গ্রহণ করতে সক্ষম।

গালাপাগোস রেসার নিয়ে এটাই কি প্রথম কোন দৃশ্য ছিল ?

না, গালাপোগাস রেসার নিয়ে এটাই প্রথম কোন দৃশ্য ছিল না। এর পূর্বে ২০১৩ সালে গালাপোগাস আইল্যান্ড নিয়ে করা বিবিসির গালাপোগাসে উইথ ডেভিড অ্যাটেনবরো (Galapagos With David Attenborough) ডকুমেন্টারিতে সাপের কিছু সংক্ষিপ্ত দৃশ্য ছিল।

সেখানে রেসার সাপের কিছু শিকারের মূহুর্ত দেখান হয়। কিন্ত এরকম মারমার কাটকাট চেজিং দৃশ্য প্ল্যানেট আর্থ টু এর জন্যই প্রথম ধারণ করা হয়।

প্রযোজকের বক্তব্যঃ

জি কিউ (GQ)- তে দেওয়া বক্তব্যে প্রযোজক এলিজাবেথ হোয়াইট বলেন, “ আমরা ভেবেছিলাম সাপ ইগুয়ানার জন্য অপেক্ষা করবে। তাড়া করবে এটা আমরা ভাবি নি। আমরা মেরিন ইগুয়ানার উপর একটা গল্প তৈরি করতে চেয়েছিলাম । কিন্ত সবাই কম বেশি ইগুয়ানার সাতারের দৃশ্য দেখেছে। আমাদের ক্যামেরাম্যান যে গালাপাগোসে থাকে সে রেসার স্নেকের ছোট একটা শিকারের ভিডিও দেখাল যা সে নিজে আগে ধারণ করেছিল। সেটাতে ছিল রেসার সাপের অতর্কিত হামলা ( ambush). আমি বললাম, ও এটা খুবই দারুণ এক ভিডিও । কিন্ত এখানে মাত্র একটা সাপ কে দেখানো হয়েছে। আমরা যখন লোকেশনে গেলাম তখন দেখলাম একটি ইগুয়ানা সবে মাত্র বের হচ্ছে। এবং সেটা তীর ধরে পাথুরে ঢাল বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন দেখি পুরো পাথুরে দেয়াল এক রকম সাপ ভর্তি হয়ে গেল। আমরা তাজ্জব হয়ে গেলাম। বললাম , ও গড ! তোমরা কি দেখেছ দৃশ্যটা ?

দেখলে মনে হতে পারে সাপেরা একত্র হয়ে কোন ইগুয়ানা কে তাড়া করছে। কিন্ত বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন । সব সাপ নিজের জন্য শিকার তাড়া করছে। আমরা এক সাপ অন্য সাপকে খেতে দেখেছি। এই দৃশ্য অনেক ভীতিকর। আমরা ভাবলাম , নাহ ! এই দৃশ্য ধারণ করা সম্ভব না। এটা দর্শকদের জন্য খুবই ভয়ানক দৃশ্য হয়ে দাঁড়াবে।

ওহ ! প্রতিটা মূহুর্ত আমার প্রবল উত্তেজনার মধ্যে কাটে। আমার মনে হয়েছিল আমি কোন ভয়ানক দৃশ্যের পরিচালক তখন । আমার জন্য এটা ছিল অ্যাড্রেনালিন (Adrenaline) নিঃসরণের চরম মূহুর্ত। কারণ আমার প্রায় পুরোটা সময় কাটে ইগুয়ানা কে দেখে। এবং অপেক্ষা করি যে সে কিভাবে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। পুরো সময়টা আমার হার্ট বিট হতে থাকে এবং মূলত নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করছিলাম ইগুয়ানা কি শেষ পর্যন্ত নিজেকে রক্ষা করতে পারল ? সে কি নিজেকে রক্ষা করতে পারল ? বাস্তবতা হল ইগুয়ানা দেখতে খুবই সুন্দর । আপনি বায়নোকুলার দিয়ে ইগুয়ানা কে দূর থেকে দেখতে পারবেন কিন্ত পরক্ষণেই দেখবেন সে সাপেদের ডিনারের মেন্যু হয়ে যাচ্ছে।

আমাদের জন্য সুখের বার্তা ছিল যে অনেক ইগুয়ানাই নিজেকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারে। এবং এটা আমাদের জন্য আরামদায়ক ছিল। আমরা সমুদ্রের তীরেও ইগুয়ানার বাচ্চাদের দৃশ্য ধারন করি। ইগুয়ানা সমুদ্রের তীর থেকেও সদ্যে বের হয়ে আসছিল এবং তারা বের হয়েই প্রাপ্তবয়স্ক ইগুয়ানাদের মাঝে নিজের জায়গা করে নিচ্ছিল।এ দৃশ্য খুবই সুন্দর এবং আদুরে ছিল।

“কিন্ত শুধুমাত্র আমরা একটা ইগুয়ানার বাচ্চাকে পাই যে নিজেকে পুরোপুরি সাপের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পরেও নিজেকে রক্ষা করতে পারে। ঐ ইগুয়ানাটাকে ঘিরে সাপেরা এক রকম বল বানিয়ে ফেলে। এবং সে নিজেকে সেই রোলিং বল থেকে নিজেকে বের করতে সক্ষম হয়। আশ্চর্য ব্যাপার হল ঐ দৃশ্যে আমাদের ক্যামেরার ফোকাস তেমন ভাল ছিল না। ক্যামেরাম্যান এই দৃশ্যধারণের জন্য রীতিমত নিজেকে ঘুরাচ্ছিল যেন দৃশ্যটা কোনমতেই মিস না হয়। তাই আমরা এই দৃশ্যকে ভাল ফোকাসে ধারণ করতে পারি নি। কিন্ত এটা ছিল এক শক্তিশালী মূহুর্ত এবং তা শেষ পর্যন্ত আমাদের ডকুমেন্টারিতেও স্থান করে নেয়।”

আমার ধারণামতে এটা ছিল অনেকটা ভয়ের ছবির দৃশ্যের মত। যারা সাপ কে ভয় পায় তাদের নিকট এই দৃশ্য পাশবিক মনে হতে পারে। আমিও নিজে সাপ অতটা পছন্দ করি না ! কিন্ত তারা মৃদু বিষধর সাপ। এই সাপেরা মানুষের প্রতিও আগ্রহী নয়ix!

এ দৃশ্য দ্বারা বিবিসির অর্জনঃ

এই নির্দিষ্ট দৃশ্যটির জন্য বিবিসি বৃটিশ মিডিয়ার সম্মানজনক বাফটার ( BAFTA) ভার্জিন্স মাস্ট সি মোমেন্টস ক্যাটাগরি তে পুরষ্কৃত হয়।

পদক অনুষ্ঠানে বিবিসির ন্যাচারাল হিস্টোরি ইউনিটের (BBC Natural History Unit) সিনিয়র প্রযোজক (Senior producer) মাইকেল গুন্টন ( Michael Gunton) বলেন,

                “ ব্লাইমি ! আমি ঐ ইগুয়ানাদের ভালোবাসি ! আমি বাফটাতে প্রায় ত্রিশ বছর পূর্বে আসি ট্রায়ালস অফ লাইফ সিরিজের( Trials of Life) জন্য। এরপরে আর আসা হয় নি। এরপর এই দ্বিতীয়বার আসার সৌভাগ্য হল। আশা করি আবারো আগামি ত্রিশ বছরের মধ্য আরেকবার আসার সুযোগ পাব”।

আমরা এ পুরষ্কারটা যে দৃশ্যের জন্য অর্জন করি মজার ব্যাপার হল বেশিরভাগ মানুষ অন্তত কমপক্ষে অর্ধেক মানুষ যাই হোক তারা দৃশ্যটা দেখে তাদের সোফার পিছন থেকে আর বাকি অর্ধেক মনে করে এই দৃশ্যটা ছিল তাদের দেখা জীবনের সবথেকে অসাধারণ কোন কিছু। তো, আমি মনে করি যারা এই দৃশ্যটি দেখার সময় চিৎকার করেছিল, ইগুয়ানা পালাও ! পালাও ইগুয়ানা ! তারাই আমাদেরকে এই পুরষ্কার দেওয়ার জন্য ভোট প্রদান করে। তো, তাদেরকে আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি x

এই ভিডিওটির ব্যাপারে আমাদের বাচ্চাদের অনুভূতিঃ

আমাদের ঘরের বাচ্চারা এই ভিডিওটি নিয়ে এখন পর্যন্ত মিশ্র অনুভূতি প্রদর্শন করে । যেমনঃ সাফওয়াত ()সে ভিডিওটি উপভোগ করে ঠিকই কিন্ত আবার ভয়ও পায়। বিশেষ ক্ষেত্রে সাপগুলো যখন একটার একটা ইগুয়ানা শিকার করতে থাকে তখন সে ভয় পেয়ে পর্দার আড়ালে লুকোয়। আবার যখন চেজিং দৃশ্য চলে আসে আবার সে পর্দা থেকে সড়ে এসে চেয়ারে গিয়ে বসে।

এরকম বেশ কয়েকবার সে উঠাবসা করে। অন্যদিকে সাহিব (.) সে এখন পর্যন্ত এই ভিডিওটির ভীতিকর বিষয়টি বুঝে উঠতে সক্ষম হয় নি। তাই সে উপভোগই করে। আর এটা কি জিজ্ঞেস করে তার জিজ্ঞাসু মন কে খুশি রাখে ।

তথ্যের উৎসঃ 

 

iPage no: 327 ; California Academy of Sciences ; Fourth Series ; Vol : I ; 1907-1912 ; San Fransico ; Published by The Academy 1912.

viiihttps://www.youtube.com/watch?v=YG3l7VxaNcc

Leave a Reply

Your email address will not be published.