অস্ট্রেলিয়ার যে তের প্রজাতির প্রাণীর বিলুপ্তির খাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে নাম উঠল

অস্ট্রেলিয়ার যে তের প্রজাতির প্রাণীর বিলুপ্তির খাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে নাম উঠল

অস্ট্রেলিয়ার সরকার অফিশিয়ালি তেরটি প্রজাতির প্রাণীর বিলুপ্তি ঘোষণা করে। এদের মধ্যে আছে এক প্রজাতির সরীসৃপ এবং বারো প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। ইউরোপিয়ানরা আসার পর প্রথম কোন সরীসৃপ বিলুপ্তির ঘটনা ঘটল।

বারো প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিলুপ্তির দ্বারা অস্ট্রেলিয়ার ব্যাপারে আবারো প্রমাণ হল যে তারা এখনো স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিলুপ্তির ব্যাপারে সবার থেকে এগিয়ে আছে। যা সত্যিকারার্থেই হতাশাজনক। এই নিয়ে মোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর বিলুপ্তির সংখা দাড়াল ৩৪ ।

তের প্রজাতির স্তন্যপায়ীদের বিলুপ্তি হঠাৎ করে হয় নি। সবগুলোর মধ্যে একটির বিলুপ্তি অবশ্য ঐতিহাসিক। এদের বেশিরভাগেরই দেখা পাওয়া যায় নি ১৮৫০ থেকে ১৯৫০ এর মধ্যে। লিস্টে থাকা দুটো প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটে গত দশকে। দুটোরই বিলুপ্তি হয় খৃস্টমাস আইল্যান্ড এবং ভারত মহাসাগর হতে। এক প্রজাতির বাদুড় পিপিস্টেরিল (pipistrelle) এর মৃত্যু ঘটে ২০০৯ সালে খৃস্টমাস আইল্যান্ডে। খৃস্টমাস আইল্যান্ডের সরীসৃপ খৃস্টমাস আইল্যান্ড ফরেস্ট স্কিংক ( Christmas Island Forest skink) বা অঞ্জলির বিলুপ্তি ঘটে ২০১৪ সালে। দু প্রজাতিরই বিলুপ্তি হয়ে যাওয়ার বিষয়টা IUCN দ্বারা রেকর্ডকৃত।

আপডেটেড লিস্টের দ্বারা বুঝা যায় ৩২০ প্রজাতির ভূমির স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে দশ পার্সেন্টেরও বেশি স্তন্যপায়ী প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটেছে যাদের ১৭৮৮ সালে দেখা পাওয়া যেত।

এ ব্যাপারে ওয়াইল্ডেরনেস সোসাইটির (The Wilderness Society) সুজান মিলথ্রোপ (Suzanne Milthrope) বলেন, ধনী কিংবা গরিব কোন দেশে এরকম স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিলুপ্তি হওয়ার রেকর্ড নেই। তিনি আরো বলেন, আমাদের পরেই আছে হাইতির অবস্থান । কিন্ত তাদেরও সতন্যপায়ী প্রাণীর বিলুপ্তির সংখ্যা নয়।

প্রোফেসর জন ওয়িনার্স্কি ( Prof John Woinarski) চার্লস ডারউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কানজারভেশন বায়োলজিস্ট যিনি তার দুটো বইয়ে নতুন বিলুপ্ত হওয়া প্রাণীদের তালিকাকে অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি বলেন , এই তালিকাটি আড়ষ্ট করে ফেলার মত। সে আরো বলেন, এই লিস্ট দ্বারা আবারো প্রমাণ হল যে কোন প্রাণী বিপদ্গ্রস্ত (Threatened) ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর সেই প্রাণীকে যদি রক্ষার জন্য কোন ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে তা নিশ্চিত বিলুপ্তির পথেই এগোয়। আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা অলরেডি ক্ষতির সম্মখীন হয়েছি এরপরে যদি বাদবাকি বিপদ্গ্রস্ত প্রাণীদের ব্যাপারে আমরা কোন পদক্ষেপ না নেই তাহলে আবারো আমাদের এরকম পরিস্থিতির সম্মখীন হতে হবে।

যে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা নিশ্চিতভাবে বিলুপ্তি হয়েছে তারা হল ডেজার্ট বেটং (Dessert Bettong) , নালাবরের বামন বেটং ( Nullarbor dwarf bettong), ক্যাপরিকন খরগোশ ইঁদুর ( Capricorn rabbit rat) , ব্রড চেকড হপিং মাউস ( Broad-cheeked hopping mouse ), লিভারপুল প্লেইন স্ট্রাইপড ব্যান্ডিকোট (Liverpool Plains striped bandicoot ), মার্ল (Marl) , সাউথ ইস্টার্ন স্ট্রাইপড ব্যান্ডিকোট (South-eastern striped bandicoot), নালাবার বেয়ার্ড ব্যান্ডিকোট (Nullarbor barred bandicoot ), লম্বা কানের ইঁদুর (Long-eared mouse ),ব্লু গ্রে মাউস (blue-grey mouse) এবং পার্সি আইল্যান্ড ফ্লাইং ফক্স (Percy Island flying fox )

ওয়িনার্স্কি বলেন , সম্ভাব্য বিলুপ্তির মূল কারণ ফেরাল ক্যাট, বাহির থেকে নিয়ে আসা শিয়াল, বাসস্থান ধ্বংস এবং দাবানল কে আমরা সান্তনাদায়ক কারণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। তিনি আরো বলেন, গত দুশত বছরে কোন দেশ এরকম বিলুপ্তির সম্মখীন হয় নাই। যাদুঘরে বেশিরভাগ স্পেসিসেরই রেকর্ড ছিল না সেক্ষেত্রে বিলুপ্তি সিউর হওয়ার জন্য রিমোর্ট এলাকাতে থাকা আদিবাসি বৃদ্ধদের কথা শুনে সিউর হতে হয় যাদের এই প্রাণিদের সরাসরি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।

IUCN প্রায় একশোর মত স্থানীয় (এন্ডেমিক) প্রাণীদের তালিকাবদ্ধ করেছেন যাদের বিলুপ্তি ঘটেছে। ওয়িনার্স্কি মনে করেন আসল সংখ্যা একশ থেকেও দশগুণ বেশি হবে যদি আমরা বিলুপ্ত হওয়া অমেরুদন্ডী প্রাণিদের অন্তর্ভুক্ত করি। এক খৃস্টমাস আইল্যান্ডেই পঞ্চাশের মত অমেরুদন্ডী প্রাণীর গত একশো বছরে দেখা পাওয়ার কোন রেকর্ড নেই। তাদের বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভবনাই বেশি।

অস্ট্রেলিয়ার এই আধুনিক বিলুপ্তির মহড়াতে প্রথম কোন সরীসৃপের যোগ হওয়া সত্যিকারার্থেই বিলাপযোগ্য। খৃস্টমাস আইল্যান্ডের ফরেস্ট স্কিংক প্রায় সব মারা পড়ে এশিয়া থেকে দুর্ঘটনাক্রমে নিয়ে আসা ঘরগিন্নী সাপের (Wolf snake) দ্বারা ১৯৭০ সালে।

আর খৃস্টমাস আইল্যান্ডের পিপেস্টেরিল বাদুড়ের বিলুপ্তির পিছনে সরকারের কার্যকরি পদক্ষেপ না নেওয়া অন্যতম কারণ বলে আমি মনে করি। তিনি বলেন, গত বিশ বছর ধরেই দেখা যাচ্ছিল যে এই প্রজাতির বাদুড়ের সংখ্যা খুব দ্রুততার সাথে কমে আসছে। তখনই কোন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। কিন্ত সরকারের অপর্যাপ্ত সাড়া দেওয়া এক্ষেত্রে কোন অবদান রাখতে পারে নাই। এ ব্যাপারে কোন অনুসন্ধানমূলক তদন্তই হয়নি যে নির্দিষ্ট কি কারণে এই প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটছে। অত্যন্ত এই প্রজাতিকে বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করার জন্য আমাদের তৎপর হওয়া উচিত ছিল।

মিলথ্রোপ বলেন, “এই প্রাণী বিলুপ্তির আপডেট লিস্ট অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশ সংক্রান্ত কর্মসূচীর দুর্বলতা প্রকাশ করে। এর দ্বারা বুঝা যায় যে আমরা বিশ্বে স্তন্যপায়ী প্রাণী বিলুপ্তি হওয়ার পিছনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। যা লজ্জাজনক। পরিবেশ মন্ত্রি সুসান লের এই ব্যাপারে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে এনভায়রনঅমেন্ট প্রোটেকশন এন্ড বায়োডায়ভার্সাটি কনজারভেশন ( Environment Protection and Biodiversity Conservation ) বা সংক্ষেপে ( EPBC) এর আইনের ব্যাপারে কমপিটিশন ওয়াচডগের (ACCC) গ্রায়েম স্যামুয়েলের (Graeme Samuel) রিভিউ নিয়ে কাজ করা উচিত। স্যামুয়েল চিহ্নিত করেন যে , পরিবেশ অস্থির এক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং দিন দিন ক্ষতির সম্মখীন হচ্ছে। EPBC এর কর্মপন্থা কার্যকরি ছিল না। এবং তাদের কর্মপন্থায় খুব জরুরী ভিত্তিতে কিছু পরিবর্তন আনা দরকার। কিন্ত বলতেই হয় এখন পর্যন্ত মরিসনের ( Morrison) সরকারের এ নিয়ে পুরোপুরি কোন সাড়া এখন পর্যন্ত আমরা পাই নি। তারা তাদের দায়িত্বকে শুধুমাত্র বিচ্ছিন্নভাবে রাজ্যগুলোর দিকে ঠেলতে চায়।মিলথ্রোপ আরো বলেন, স্যামুয়েলের রিভিউতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নতুনভাবে যে সুপারিশ করা হয়েছে তা ছাড়া প্রাণীদের বিলুপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব না।

অস্ট্রেলিয়ার সরকারের ভাষ্যমতে তারা ২০১৪ সাল থেকে ৫৩৫ মিলিয়ন ডলার থেকেও বেশি ব্যয় করা হয়েছে বিপন্ন প্রাণীদের সংরক্ষণ করার জন্য। এবং তারা শিকারি প্রাণী (ইনভেসিভ বা আগ্রাসী) থেকে অস্ট্রেলিয়ার জীব জগত সুরক্ষার জন্য দশ বছরের পরিকল্পনা নিয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে তারা অলরেডি খৃস্টমাস আইল্যান্ডে সহ পুরো অস্ট্রেলিয়া জুড়ে অস্ট্রেলিয়ার গাছ পালা এবং প্রাণীদের সংরক্ষণের জন্য কাজ করে আসছে। তাদের কাজের মধ্যে ব্ল্যাক সামারের দাবানলের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার পদক্ষেপও রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার সরকার পদক্ষেপ নিলেও তা আদৌত সফলতার মুখ দেখছে না। এজন্য তারা যে পদক্ষেপ নিয়ে আসছে তা বরাবরই পর্যাপ্ত নয়। সরকারের উচিত বায়োলজিস্ট এবং ন্যাচার অ্যাক্টিভিস্টদের পরামর্শ গ্রহণ করে সেভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এতে আশা করি অস্ট্রেলিয়ার জীববৈচিত্র্য আলোর মুখ দেখবে।

 

গার্ডিয়ান পত্রিকার এ সংক্রান্ত কলাম অবলম্বনে আর্টিকেলটি লেখা। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *