ড. রেজা খানের নতুন বই ‘স্থলভাগের বৃহত্তম প্রাণী হাতি’। বুক রিভিউ।

ড. রেজা খানের নতুন বই ‘স্থলভাগের বৃহত্তম প্রাণী হাতি’। বুক রিভিউ।

Spread the love

. রেজা খান স্যারের বই স্থলভাগের বৃহত্তম প্রাণী হাতি বা সংক্ষেপে যদি বলি তাহলে হাতিবইটি বাংলা ভাষাতে বন্য প্রাণী নিয়ে লেখা অন্যতম একটি সংযোজন। এবং বলতেই হয় রেজা স্যারের অন্যান্য বইয়ের মত এই বইটিও বাংলা ভাষাতে বন্য প্রাণী নিয়ে চর্চা কে আরো সমৃদ্ধ করবে।. রেজা খান বাংলাদেশের যে কয়েকজন হাতে গোনা ওয়াইল্ড লাইফ স্পেশালিস্ট আছেন যাদের কর্ম এবং গবেষণা বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং তালিকাবদ্ধ রাখার ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে তাদের মধ্যে তিনি একজন।

 

আমার এই বইটি পড়ার পূর্বেও বিভিন্ন পত্রিকাতে বন্যপ্রাণী নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তার লেখা অনেক কলাম এবং তাঁর লেখা পাখিবিশারদ সালিম আলীবই পড়ার সুযোগ হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী নিয়ে কোন লেখা লিখতে হলে সেই বন্য প্রাণীর অবস্থান এবং বিস্তারিত জানার জন্য তার লেখা চেকলিস্ট Wildlife of Bangladesh Checklist and Guideথেকে তথ্য নেওয়াটা যেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। এছাড়া বহু বছর আগে বাংলা একাডেমি থেকে বন্যপ্রাণী নিয়ে লিখিত বইয়ের সিরিজ বাংলাদেশের বন্যপ্রাণীযেন মাস্ট রিড বই। যদিও ঐ বইসমূহ এখন আর বাজারে পাওয়া যায় না। তাই আমার এ লেখা যদি স্যার পড়ে থাকেন তাহলে স্যারকে অনুরোধ করব আপনার বন্যপ্রাণী সিরিজের এই বইগুলো আবার নতুন সংস্করন করে বাজারে আনানোর ব্যবস্থা করা যায় কিনা বিষয়টা একটু ভেবে দেখবেন। যাই হোক, আমরা এবার আমাদের আলোচিত বই নিয়ে কথা বলি।

ড. রেজা খান । ছবিটি Gulf News হতে নেওয়া।

এই বইটি কেন স্পেশাল?

বাংলাদেশে হাতি অন্যতম নেটিভ বন্য প্রাণী। বড় আকারের বন্য প্রাণী দেখতে হলে মানুষের যেতে হয় বনে আর নয়তো চিড়িয়াখানাতে। কিন্ত হাতির বিষয়টি আলাদা। হাতিকে মানুষ গৃহপালিত করতে না পারলেও একে মানুষ বশে আনতে সক্ষম হয়েছে যে কারণে আমাদের ছোট বেলা হতে শুরু করে এখনো অনেক স্থানেই সার্কাসের জন্য বা অন্যকোন উদ্দেশ্যে হাতির ব্যবহার চোখে পড়ার মত। যা এখন অনেকটা কমে আসলেও কিন্ত বন্ধ হয়ে যায়নি অর্থাৎ হাতি‘-র বসবাস যত দূরেই হোক না কেন একে নিয়ে সবারই কম বেশি স্মৃতি রয়েছে। ঠিক আমারো আছে। তাই বইটি যখন পড়ছিলাম বইয়ের কিছু অংশে সেই ছোটবেলার স্মৃতিগুলো ভেসে উঠে । মামার হাত ধরে সার্কাসে যাওয়া । সেখানে ছোট হাতির বাচ্চা দেখে পুলকিত হওয়া। এবং বড় হাতি দেখে ভয় পেয়ে যাওয়া এ স্মৃতিতো ভোলার নয়। আমার মনে আছে, একটা সার্কাসের হাতি একবার মাটির রাস্তা পার হয়ে আমাদের নানাবাড়ির দিকে আসে। যেহেতু মাটির রাস্তা তাই রাস্তার অনেক স্থানে হাতি তার পায়ের চিহ্ন রেখে যায়। এবং তা মোটামুটি ভালোই বড় সাইজের গর্ত টাইপের ছিল। আমি প্রতিদিন হাতির পায়ের তৈরি ঐ গর্তগুলোর কাছে গিয়ে ভাবতাম এত বড় প্রাণী ! কিভাবে হাটে কিভাবে চলে কিভাবে ঘুমায়। অর্থাৎ হাতিনিয়ে জানার যে আগ্রহ এবং কৌতুহল তা যেন সেই ছোটবেলায় তৈরি। যে জিনিস মিটবার নয়।

এই বইয়ের বিশেষ দিকঃ

এই বইয়ের বিশেষ দিক হল এই বইটি যিনি লিখেছেন তিনি নিজে একজন স্বনামধন্য বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ। এবং হাতিনিয়ে তাঁর নিজের গবেষণা রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বন্যপরিবেশে হাতিরা কিভাবে থাকে কিভাবে জীবন কাটায় সে ব্যাপারে তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান রয়েছে। এবং রেজা খান যেহেতু আবু ধাবির আল আইন চিড়িয়াখানার বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং বর্তমানে দুবাই সাফারি পার্কের প্রিন্সিপাল ওয়াইল্ড লাইফ স্পেশালিস্ট হিসেবে কর্মরত আছেন । তাই স্বাভাবিকভাবেই হাতি‘-কে তার পক্ষে যতটা একজন গবেষক হিসেবে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে এরকম সুযোগ খুব কম ব্যক্তিরই হয়েছে বলে আমি মনে করি। এবং বইতেও এই বিষয়টির স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। লেখক অসংখ্য স্থানে হাতির নানা কর্ম নিয়ে তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। যেমনঃ বইয়ের এক অধ্যায় যার শিরোনাম হাতির জীবনযাত্রা , খাদ্য, বাসস্থান ও বংশবৃদ্ধিএখানে তিনি প্রসঙ্গক্রমে এক আলোচনাতে টেকনাফের যাদির মোড়াতে পথ হারিয়ে যাওয়া এক বাচ্চা হাতির কাহিনী তুলে ধরেন। কাহিনীটি এত স্পষ্ট করে তিনি লিখেছেন যেন মনে হবে আপনি হাতি নিয়ে প্রবন্ধ পড়তে পড়তে কোন বাস্তব গল্পে চলে এসেছেন। অর্থাৎ যে বায়োলজিস্টরা নিজেদের অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখে সেই বই শুধুমাত্র প্রবন্ধ নির্ভরই হয় না সেখানে অসংখ্য অভিজ্ঞতা শেয়ার হয় গল্প এবং কাহিনীর আলোকে। যা একজন পাঠক কে একঘেয়েমিতায় ভোগায় না। বরং বইটি আরো গুরুত্বের সাথে পড়ার ব্যাপারে মনোযোগ আকর্ষন তৈরি করতে সাহায্য করে। এই বইটিও এর ব্যতিক্রম নয়। এই বইয়ের অসংখ্য স্থানে রেজা খান তার এরকম অভিজ্ঞতা পাঠকের সাথে শেয়ার করেছেন। 

বই নিয়ে মূল আলোচনা

বইটিকে মোট নয়টি অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। এই নয়টি অধ্যায়ে হাতির ঐতিহাসিক পটভূমি, বিশ্বে বাংলাদেশের হাতি প্রসঙ্গ, হাতির আবির্ভাব ও বিবর্তন , হাতির বিভিন্ন প্রজাতি ও বিস্তৃতি , হাতির দৈহিক গঠন ও অঙ্গ প্রত্যয়, হাতির জীবনযাত্রা, হাতি ধরার পদ্ধতিঃ খেদা, চিড়িয়াখানার হাতি এবং হাতি কর্তৃক ক্ষয়ক্ষতি এবং বাংলাদেশে হাতি সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা । এ অধ্যায়গুলোতে পর্যায়ক্রমে অসংখ্য অজানা তথ্য উঠে এসেছে। যা বাংলাভাষীদের জন্য নির্দিষ্ট করে খুঁজে পাওয়া অনেকটা কঠিন হত যদি না এগুলো একত্র করে এই বইতে উল্লেখ করা হত। যেমনঃ

প্রথম অধ্যায়ে ঢাকার পিল খানার ইতিহাস উঠে এসেছে। এই পিলখানার সাথে যে ঐতিহাসিকভাবে হাতির সম্পর্ক জড়িয়ে আছে তা কয়জন বাংলাদেশীই বা জানে। আপনি কি জানতেন , পিলখানার পিল মূলত হাতির আরবি শব্দ ফিলথেকে এসেছে। এই বইটি পড়ার আগ পর্যন্ত আমি তা জানতাম না। বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়েই অসংখ্য চমকপ্রদ তথ্য এসেছে।

দ্বিতীয় অধ্যায়টি সাজানো হয়েছে বিশ্বে বাংলাদেশের হাতি প্রসঙ্গনিয়ে। অর্থাৎ এই ঢাকার পিলখানা থেকে হাতি প্রশিক্ষিত হয়ে কিভাবে আমেরিকা পর্যন্ত পৌছায় সে ব্যাপারে বিস্তারিত বয়ান এখানে আছে। রেজা খান এই অধ্যায়টি লিখতে গিয়ে রীতিমত অনুসন্ধানে নেমেছিলেন বলে মনে হয়েছে। বাংলাদেশে থেকে বিশ্বের নানাপ্রান্তে যে হাতিগুলো বিভিন্ন সময়ে নানা দেশে পাঠানো হয়েছে এবং যেগুলো নথিতে পাওয়া যায় সে হাতিগুলোর শেষ গন্তব্য কি ছিল এ ব্যাপারে তিনি নানাভাবে তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছেন। এবং তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগও করেছেন।

তৃতীয় অধ্যায়টি হাতির আবির্ভাব ও বিবর্তননিয়ে। এ অধ্যায়ে আমরা হাতি বলতে যাদেরকে বুঝি পৃথিবীতে এদের আবির্ভাব কবে নাগাদ হতে পারে এবং এর পূর্ববর্তী অ্যানসেস্টর বা পূর্বপুরুষ কারা ছিল এসব নিয়ে গবেষকদের পেশ করা সর্বশেষ তথ্যসমূহ তিনি সংযোজন করেছেন।

চতুর্থ অধ্যায়ে হাতির বিভিন্ন প্রজাতি ও বিস্তৃতি নিয়ে বিষদ আলোচনা করেছেন। এবং হাতির মূল দুই প্রজাতির মধ্যকার পার্থক্য পাঠক যেন সহজে বুঝতে পারে এজন্য তিনি আলাদা টেবিল আকারে এশিয়ান হাতি এবং আফ্রিকান হাতির মধ্যকার পার্থক্য তুলে ধরেছেন। আমার মনে হয়, এই অধ্যায়টি পড়ার পর একজন সাধারণ মানুষও হাতির প্রজাতি সমূহকে একে অপরের থেকে আলাদা করার যোগ্যতা অর্জন করবে। এবং হাতির বিস্তৃতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা উঠে এসেছে এখানে। এখানে বিভিন্ন জরিপে বাংলাদেশে হাতির মোট সংখ্যা কত সেই ডেটা চলে এসেছে। এমনকি কর্মী হাতি, সার্কাসের হাতি এবং চিড়িয়াখানার হাতির সংখ্যাও বাদ যায়নি। হাতির স্থায়ী এবং অস্থায়ী আবাসস্থল দুটোকেই তালিকাতে আলাদা করে স্থান দেওয়া হয়েছে। তিনি বিভিন্ন জরিপের তথ্য সমূহ উপস্থাপন করে সর্বশেষে নিজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামারি তুলে ধরেছেন। এখানে বর্তমানে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাতি প্রবেশ করে জানমালের ক্ষতিসাধনের বিষয়টি উঠে আসে। একইসাথে শেরপুর এবং নেত্রকোণা জেলাতেও যে একই ধরণের ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটছে সে বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।

এখানে একটা ব্যাপক কিন্তনিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। অবস্থাদৃশ্যে নানা জরিপ দেখলে মনে হবে প্রকৃতিতে বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা বাড়ছে। কিন্ত এখানে একটা বড় কিন্তরয়েছে। যেখানে হাতি বসবাসের উপযোগী প্রাকৃতিক বনের পরিবেশ প্রতি বছরই আশঙ্কাজনকহারে কমে আসছে সেখানে প্রকৃতিতে হাতি বাড়ছে এরকম চিন্তা করাটা সঠিক নয়। অর্থাৎ হাতির যে বৃদ্ধি আমরা দেখতে পাচ্ছি জরিপে তা প্রাকৃতিক বনে নয়। এই বৃদ্ধিটা মূলত কুড়িগ্রাম, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোণা এবং মৌলভীবাজারের ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকার ধ্বংসপ্রায় শাল ও মিশ্র চিরসবুজ বন বা সরকারের লাগানো বাণিজ্যিক বনে। কিন্ত ঐ এলাকা সমূহ হাতির মত বড় প্রাণীর বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই মানুষ এবং হাতির মধ্যকার সংঘর্ষ বাড়িয়ে তুলবে। এই বিষয়টা রেজা স্যার এখানে খুব সুন্দরভাবে নোট করেন। এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গরা যেন পরবর্তী জরিপসমূহে এই বিষয়টি কি প্রসঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেন সেই অনুরোধ তিনি রাখেন।

এই অধ্যায়ে হাতির শারীরিক নিখুঁত বর্ণনাও তিনি তুলে ধরেছেন। হাতির কান ও শ্রবনশক্তি , হাতির চোখ ও দৃষ্টিশক্তি কোন আলোচনাই বাদ যায়নি। এবং হাতি কিভাবে এগুলো ব্যবহার করে প্রকৃতিতে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে সেই আলোচনাও উঠে আসে।

এর পাশাপাশি স্যার এই অধ্যায়ে একটা বিশেষ বিষয় উল্লেখ করেছেন যে ব্যাপারে আমি মনে করি আমাদের বিশেষজ্ঞ মহলের এখন হতেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। স্যার উল্লেখ করেন যে, এশিয়ার হাতির প্রজাতিকে অনেকে (ভারতীয় প্রাণী গবেষক বা এ সংশ্লিষ্ট যারা একাডেমিকলি কাজ করেন) ‘ভারতীয় হাতিনামে চালানোর চেষ্টা করছেন যা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই অশোভন

এই অশোভনীয় কাজ কিন্ত নতুন নয়। অনেক প্রাণীকেই বহির্বিশ্বে তারা পরিচয় করিয়ে দিয়েছে বা দিচ্ছে ইন্ডিয়ান হিসেবে কিন্ত এই প্রাণীগুলোর নেটিভ রেঞ্জ দেখা যায় পুরো দক্ষিন এশিয়া জুড়েই রয়েছে কিন্ত তারপরেও সেই প্রাণীর নামের আগে ইন্ডিয়ান শব্দটা ইচ্ছাকৃতভাবে যোগ করে দেওয়ার মত বেমানান কাজটা তারা করে যাচ্ছে। এখানে বেশ কিছু এরকম প্রাণীর উদাহরণ দেওয়া যাবে। কিন্ত তাতে করে মূল প্রসঙ্গ পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে বলে এই বিষয়টাকে এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ রাখলাম।

ষষ্ঠ অধ্যায়টি সাজানো হয়েছে হাতির জীবনযাত্রা, খাদ্য , বাসস্থা ও বংশবৃদ্ধি নিয়ে। এখানে হাতির প্রাকৃতিক খাদ্য এবং আটকাবস্থায় হাতি কি খায় তা নিয়ে বিস্তারিত লেখা হয়েছে। হাতির বাসস্থান নিয়েও কথা উঠে এসেছে। হাতি প্রসঙ্গে এখানে স্যার একস্থানে বলেন, “হাতি উন্মুক্ত প্রাঙ্গনের ঘাসবন পছন্দ করলেও সচরাচর সাগরতীরে যায় না। আমি এ ব্যাপারে স্যারের কথার পাশে ছোট করে একটা তথ্য একটু যোগ করতে চাই। এই বিষয়টি এশিয়ান এবং আফ্রিকান বেশিরভাগ হাতির ক্ষেত্রে সত্য হলেও আমার নিকট মনে হয় কঙ্গোর ঘন অরন্য লোয়াঙ্গো ন্যাশনাল পার্ক বসবাস করা হাতিদের ব্যাপারটি ভিন্ন। এই বনের হাতিদেরকে নিয়মিতই সমুদ্রতীরে আসতে দেখা যায়। হয়তবা এটা লবনের লোভে হয়ে থাকতে পারে।

একটি এশিয়ান হাতি ( Elephas maximus) । ছবিটি ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক হতে তোলা এবং তুলেছেন রিভিউ লেখক Saowabullah Haque.

এই অধ্যায়ে হাতির বাসস্থানের জন্য কিরকম পরিবেশ হওয়া বাঞ্চনীয় এগুলোও উঠে আসে। এবং চিড়িয়াখানাতে হাতির থাকার উপযুক্ত পরিবেশ কেমন হতে পারে তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা উঠে এসেছে। আমার নিকট মনে হয় এখানে বাংলাদেশের চিড়িয়াখানাতে হাতির বাসস্থানের একটা দৃশ্য উঠে আসলে বিষয়টা মন্দ হত না। তাহলে আমরা হাতির আটকাবস্থায় আদর্শ বাসস্থানের সাথে বাংলাদেশের চিড়িয়াখানার হাতিদের বাসস্থানের একটা তুলনামূলক আলোচনা করতে পারতাম।

সপ্তম অধ্যায়ে খেদানিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে। অর্থাৎ যে উপায়ে বন্য হাতিকে ধরা হয়। সে বিষয়টি উঠে এসেছে। এটা একটা ইন্টারেস্টিং অধ্যায় বলে আমি মনে করি। কেননা, এখানে আপনি এরকম অনেক শব্দের সাথে পরিচিত হবেন যা শুধুমাত্র এককালে হাতি ধরা সংশ্লিষ্ট লোকদের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। হাতির খেদায় কি পরিমাণ জনবল ব্যবহার হত এবং এই জনবল চালাতে কি পরিমাণ অর্থ খরচ হত সব আলোচনা এখানে উঠে এসেছে। স্যার এখানে হাতির খেদা যে বৃটিশ অফিসারদের অধীনে হত তাদের নানা দলীল দস্তাবেজ ঘেটে খেদা যেসব এলাকায় হত সেই সব এলাকার একটা বর্ণনা তুলে ধরেছেন। স্বাভাবিকভাবেই এগুলো এত আগের ঘটনা যে তখনকার মানচিত্রের সাথে বর্তমান মানচিত্রের বিস্তর ফারাক থাকবে তা তো বলাই বাহুল্য।

অষ্টম অধ্যায়ে হাতির দ্বারা ক্ষয়ক্ষতির প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। এই অধ্যায়ের শিরোনাম হল ,চিড়িয়াখানার হাতি এবং হাতি কর্তৃক ক্ষয়ক্ষতিএখানে বাংলাদেশের চিড়িয়াখানার বিভিন্ন হাতির প্রসঙ্গ উঠে আসে। এবং সে হাতি সমূহের আয়ুষ্কাল নিয়ে তিনি আলোচনা করেন। বাংলাদেশের চিড়িয়াখানার আলোচিত হাতি পবনতারা‘-র বয়স নিয়ে বিস্তর আলোচনা উঠে এসেছে। এবং এ নিয়ে পত্রিকার তথ্যসমূহের মধ্যকার গড়মিল নিয়ে তিনে লিখেন।

এছাড়া হাতির দ্বারা কি পরিমাণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে তার একটা আলোচনাও এখানে রয়েছে। হাতির দ্বারা গত কয়েক বছরে কি পরিমাণ মানুষ নিহত হয়েছে তার কিছু সংখ্যা তিনি তুলে ধরেন। তবে আমার নিকট মনে হয়েছে এখানকার তথ্যগুলো আরো একটু আপডেইট করতে পারলে ভালো হত। কেননা, এখানে ২০১২ সাল পর্যন্ত কত জন মানুষ মারা গিয়েছে সেই ডেটা উল্লেখ করা হয়েছে। যা প্রায় এগারো বছর আগের। এটা আরেকটু আপডেইট করে ২০২০ পর্যন্ত আনতে পারলে বর্তমান পরিস্থিতি পাঠকদের নিকট আরো স্পষ্ট হত বলে আমি মনে করি। তাছাড়া মানুষ মৃত্যুর পাশাপাশি হাতি দ্বারা ঐ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের আর্থিক ক্ষতির একটা পরিমাণ তুলে ধরতে পারলেও আমার নিকট মনে হয় এই অধ্যায়টি পূর্ণতা পেত। হাতি দ্বারা যে অঞ্চলের মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মখীন হয়েছে সংশ্লিষ্ট বিট অফিস সমূহ থেকে আদৌ সেই ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারন করা হয় কিনা এরকম কিছু তথ্য পাশাপাশি সরকার থেকে কি পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদেরকের তা নিয়েও কিছু আলোচনা থাকতে পারত বলে আমি মনে করি ।

নবম অধ্যায়টি বইয়ের সর্বশেষ অধ্যায়। যার শিরোনাম হল, বাংলাদেশে হাতি সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা। এই অধ্যায়টি পুরো বইয়ের অন্যতম শেষ গুরুত্বপূর্ণ উপস্থাপনা। এই অধ্যায়ের শুরুতে বাংলাদেশের বন কিভাবে পর্যায়ক্রমে ধ্বংস হয়েছে সেই বিষয়টি উঠে আসে। এর মূল শুরুটা যে বৃটিশদের হাত ধরে এবং পরবর্তীতে বৃটিশদের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার কোন সংশোধন না করে তা চালু রাখা এবং সর্বশেষ স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারদেরও একই রকম ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করে বনজ সম্পদ আহরণ চালু রাখা যে বন ধ্বংসের অন্যতম মূল কারণ সেই প্রসঙ্গটি উঠে আসে। তাদের এরকম কর্মের জন্য বনের ভিতর হাজার বছর ধরে যে সূক্ষবাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছিল সেই বাস্তুতন্ত্র যে বিলীন যে ভেঙ্গে পড়েছে তা বলার আর বাকি থাকে না। তারপর পাঠ্যপুস্তকে পাহাড়িদের জুম চাষের পদ্ধতিকে বিশেষ পদ্ধতি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে তা যে প্রাকৃতিক বনের জন্য অন্যতম ধ্বংসের কারণ সে বিষয়টি রেজা স্যার বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। এরপরে আসে সমভূমি থেকে হাজার হাজার মানুষকে পাহাড়ে নিয়ে সরকারি বনে স্থায়ী বসবাস করার ব্যাপারটি। রেজা স্যার এখানে দাবি করেন যে , ‘এরপরে পাহড়ে যে যৎকিঞ্চিত বন ছিল তাও প্রায় শেষ। এখানে প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় যদি পাহাড়ে পাহাড়িদের জুম চাষ সাস্টেইনবল পদ্ধতি না হয় তাহলে এক্ষেত্রে সাস্টনেইবল পদ্ধতি আসলে কি হতে পারে। যদিও এই বিষয়টি পুরোপুরি অন্য আলোচনার বিষয়। কিন্ত কনজারভেশন পলিসি তখনই সফল হওয়া সম্ভব যখন বন্যপ্রাণী এবং নেটিভ উভয়ের অধিকার সংরক্ষিত হবে বলে আমি মনে করি। স্যার এখানে স্পষ্টতই উল্লেখ করেন যে অতীতের যে ঘন অরণ্য অর্থাৎ শতশত বর্গ কিলোমিটার জুড়ে যে বিশাল বনরাজি ছিল যেখানে বন্যপ্রাণীরা স্বাধীনভাবে বিচরণ এবং অন্যান্য কাজ করতে পারত এবং কোন রকম সমস্যা ছাড়াই বংশ বৃদ্ধি করতে পারত সেই বন সমূহ এখন খন্ড খন্ড হয়ে পরিণত হয়েছে বন দ্বীপে। এরকম বাস্তবিক একটা বিষয় আসলে নজরে পড়ার মত একটা বিষয়। স্যার এখানে বলেন হাতির জীবন অনেকটা হয়ে গিয়েছে দ্বীপবাসী“-দের ন্যায়। এবং এগুলোর যে সাইড ইফেক্ট সে বিষয়টাও তুলে ধরা হয় বইতে।

এই অধ্যায়ে হাতিসহ বন্যপ্রাণি সংরক্ষণের উদ্যোগঅনুচ্ছেদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে বিশেষ করে হাতি সংরক্ষণের আসল দায়িত্ব আসলে কার উপর বর্তায় কেননা এ নিয়ে আমরা বিভিন্ন সময় নানা রকম কনফিউশন সৃষ্টি হতে দেখি। যা হওয়া আসলে উচিত নয়। এবং এই কনফিউশন কেন তৈরি হয় এবং আসল দায়িত্ব সত্যিকারি কার উপর বর্তায় সে প্রসঙ্গে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনা উঠে এসেছে। হাতি সংরক্ষণের মূল দায়িত্ব বন বিভাগের নাকি পরিবেশ বিভাগের উপর বর্তায় তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে এই অংশটুকু পাঠ করার পর।

তারপর হাতিসংরক্ষণে মানুষহাতি সংঘর্ষ কেন হচ্ছে এরকম একটি আলোচনা আছে এই অধ্যায়ে। এর পাশাপাশি সংঘাত প্রশমনে বা প্রতিরোধের নানা দিক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে।

তবে আমার মনে হয় এই অধ্যায়ে রোহিঙ্গাদের জন্য টেকনাফ এবং উখিয়া অঞ্চলের হাতিরা কিভাবে বিরূপ পরিস্থিতির সম্মখীন হয়েছে এবং এই সমস্যা কিভাবে চাইলে এড়ানো যেত তা নিয়ে একটা আলোচনা আসতে পারত। বিশেষ করে যেখানে হিউম্যানিট্যারিয়ান ক্রাইসিস এবং বায়োডায়ভার্সাটি ক্রাইসিস দুটো একে অপরের সাথে মুখোমুখি এবং এই ব্যাপক বায়োডায়ভার্সাটি লসে সরাসরি যে প্রাণীটি ব্যাপক ক্ষতির সম্মখীন হয়েছে তাহল হাতি। তাই এ ব্যাপারে গবেষক হিসেবে আমার মনে হয় রেজা স্যারের মত সম্মানিতরাই এ নিয়ে কথা বলার অধিকার রাখেন। কেননা আমরা দেখি যখন হাতি প্রসঙ্গ নিয়ে কথা আসে তখন মানুষের হিউম্যানিট্যারিয়ান স্ট্যাটাস ভুলে যাওয়া হয় আবার যখন মানুষ প্রসঙ্গে কথা আসে তখন হাতি‘-র হাজার বছরের যে ইকো ধ্বংস হয়ে যে একরকম বিলুপ্তির সম্মখীন হয়েছে তা এড়িয়ে যাওয়া হয়। যদিও কনজারভেশন ইস্যুতে এটা অনেক স্পর্শকাতর বিষয় বলে আমি মনে করি। তাই এ ব্যাপারে বইতে কিছু কথা প্রসঙ্গক্রমে উঠে আসলে তা বইকে অনেক পূর্ণতা দিত বলে আমার মনে হয়। এছাড়া রোহিঙ্গা এবং হাতিদের মধ্যকার সংঘর্ষ কমিয়ে আনার জন্য IUCN কর্তৃক টেকনাফ এবং উখিয়া জুড়ে ওয়াচ টাওয়ার বসানো হয়েছে তার সফলতাই বা কি এগুলো নিয়ে কিছু লেখা আসতে পারত বলে আমি মনে করি।

হাতিকে চাঁদা তোলার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ছবিটি মিরপুরের এক এলাকা থেকে তোলা। ছবিটি তুলেছেন রিভিউ লেখক Saowabullah Haque.

এছাড়া বর্তমান সময়ে হাতিকে মানুষের কাজে ব্যবহারের এথিক্যাল ভিউ নিয়ে একটা আলোচনা থাকতে পারত। এই প্রসঙ্গে আমার BBC-র অনেক পুরানো প্রোগ্রাম Natural World থেকে বেশকিছু ডকুমেন্টারি দেখার সুযোগ হয়েছে সেখানে হাতিকে মানুষের কাজে সাহায্য করার জন্য যেভাবে ট্রেইনিং দেওয়া হয় তা লিটারেলি ভয়াবহ বলে আমি মনে করি। যদিও হাতিকে কিভাবে ট্রেইনিং দেওয়া হয় এই বইতে স্যার কিছু আলোচনা এনেছেন কিন্ত এরসাথে কিছু এথিক্যাল ভিউ থাকাটা বা উল্লেখ করাটা উচিত ছিল বলে আমার মনে হয়। এছাড়াও মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করার জন্য হাতির যে ব্যবহার এগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে শক্তভাবে বন্ধ করা উচিত বলে আমার মনে হয়। চিড়িয়াখানাতেও হাতির ব্যবহার নিয়ে এখন সভ্য দুনিয়াতে প্রশ্ন উঠছে। আমি জানি এই ভিউ ব্যক্তি বিশেষে পরিবর্তিত হয় কিন্ত এগুলো নিয়ে একটি ছোট অনুচ্ছেদ বইটিতে থাকলে মন্দ হত না ।

বই নিয়ে সর্বশেষ কথা

বইতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সন্নিবেশ থাকলেও এই বই থেকে গবেষক হতে শুরু করে সাধারণ পাঠক যে কেউ এই বই পড়তে পারবে বলে আমার মনে হয়। কেননা বইয়ের ভাষাগত উপস্থাপনা অত্যন্ত সাবলীল এবং সহজ ভাষাতে বই লেখা হয়েছে। তাই এই বই পড়ে কঠিন মনে হওয়ার সুযোগ খুবই কম। একই সাথে বইটি যেরকম সবার পাঠযোগ্য হিসেবে লেখা হয়েছে পাশাপশি বইটি যেন তার গবেষণার ভাষা পুরোপুরি না হারায় সে ব্যাপারেও নজর দেওয়া হয়েছে। এই বইকে বাংলাভাষায় জীব বিজ্ঞান , বন্যপ্রানী ক্যাটাগোরিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে আমি মনে করি। বইয়ের মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৭৯। এই ১৭৯ পৃষ্ঠার বই সবার ব্যক্তিগত লাইব্রেরী সহ স্কুল কলেজের পাঠাগারে থাকার মত একটি বই বলে আমার বিশ্বাস। বইয়ের দাম ৪৪০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি গবেষণাধর্মী বই হিসেবে আমার নিকট এই মূল্য নির্ধারন অতিরিক্ত মনে হয় নি। যাই হোক, রেজা খান স্যার যেন আমাদের এরকম আরো মূল্যবান বই উপহার দিতে পারেন এই কামনায় এখানে বইটির রিভিউ শেষ করছি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.