আমার ডায়ারির একুশ পাতা

আমার ডায়ারির একুশ পাতা

একুশ সালে  আমার প্রাপ্তি অনেক। হয়তবা এই প্রাপ্তিসমূহ কোন ট্রফি আকারে বা কারো প্রশংসাপত্র আকারে পাই নি। কিন্ত তারপরেও আমি বলব এই বছরটাতে আমি অনেক কিছু অর্জন করেছি। বন্যপ্রাণী এবং নিজ আঙ্গিনার প্রাণীদের নিয়ে পুরোদস্তর অনুসন্ধান করার সুযোগ পেয়েছি। বন্যপ্রাণীদের পিছনে ঘুরে নিজে পেয়েছি এক অন্যরকম মানসিক শান্তি। আর আফসোসের পরিমাণ বেড়েছে যে আমার এত বছরের জীবনে কত কিছুই না মিস করলাম। এই বছরের অনুভূতিগুলো ধরে রাখার জন্য আমি আমার ক্যামেরার পুরোদসস্তুর সদ্‌ব্যবহার করি। আমি ফটোগ্রাফির উদ্দেশ্যে ছবি তুলি না। আমি ডকুমেন্টেড ছবি তুলি। আমি ছবি তুলি জানার জন্য। কোন বন্যপ্রাণীকে আরো কাছ থেকে দেখার জন্য। প্রদর্শনের জন্য নয়। কেননা ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি অনেক ব্যয়বহুল এবং ধৈর্যের এক বিষয়। এই কর্ম সবার নয়। এছাড়া ছবি সুন্দর করতে গেলে স্টাডি আবার সমানুপাতিক হারে কমে যায়। কেননা, একটা ছবি তোলা হতে শুরু করে তার পোস্ট প্রসেসিং পর্যন্ত অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। এরকম সময় ব্যয় করার পর কোন বিষয়ের উপর আলাদাভাবে গবেষণা করার সময় পাওয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ দুটো দুই জিনিস। হয় বন্যপ্রাণীর চিত্রাকর্ষক ছবি তুলতে হবে আর নয়তো ভালো গবেষণা করে বন্যপ্রাণীদের ভালো করে জানতে হবে। দুটো কাজ একই সাথে চালানো এক রকম অসম্ভব ব্যাপার বৈকি। তাই আমি যত ছবি তুলি তা যতোটা না ফটোগ্রাফি তার থেকে বেশি ডকুমেন্টারি। একেকটা ছবি যেন আমার ডায়ারির একেক পাতা। তাই কোন উদ্দেশ্য এবং পরিপূর্ণ বিবরণ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়াতে  কোন ছবি শেয়ার করা একরকম হয় না বললেই চলে। ২০২১ এর সালতামামিতে এসে হিসেব করতে গিয়ে দেখলাম কিছু ছবি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে শেয়ার না করলেই নয়। এগুলো আমার জন্য অনেক বড় অর্জন ছিল । যা নিয়ে আফসোস হয় যে এই অর্জনগুলো আরো আগে হলে কতই না ভাল হত। তাহলে চলুন আমার ডায়ারির একুশ টি পাতা হতে ঘুরে আসা যাক।

ফিঙ্গের ধাওয়াঃ

ফিঙ্গে পাখির একটি কমন ইংরেজি নাম আছে তা আমরা অনেকেই জানি না। সেই নাম হল কিং ক্রো। এর অন্যতম কারণ হল এই পাখিকে প্রায়ই কাকদের ধাওয়া করতে দেখা যায়। এটা ফিঙ্গে পাখির জন্য খুব সাধারণ বিষয় হলেও এরকম ঘটনা নিজ চোখ দিয়ে দেখতে পারাটা অতি অসাধারণ বিষয়। 

বোলতার বাসাঃ

আমাদের নিকট বোলতার (Vespa affinis) বাসা খুব সাধারণ একটি বিষয় । কেননা ছোটবেলা হতেই দেখতাম গ্রীষ্মের শুরুতে বোলতারা আমাদের বাসার কোন না কোন জায়গাতে বাসা বাঁধত। কিন্ত এবারের বাসাটা ছিল একেবারে হাতের নাগালে। আমি এদের এক ফুট দূর থেকে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি। ফ্লাশ দিয়ে ছবি তুলি। খুবই সুশৃঙ্খল্পূর্ণ এক দল। এদের কাজের ক্ষতি না করলে এরা সাধারণত কারো উপর হামলে এসে পড়ে না। তবে বিপদ কখন কার উপর চলে আসে তা বুঝা মুশকিল । তাই দূরত্ব বজায় রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আশ্চর্য ব্যাপার হল বোলতা এবং মৌমাছি পরস্পরের শত্রু। এত বড় একটা বোলতার বাসা থাকা সত্ত্বেও এবার আমাদের বাসাতে চারটা মৌমাছির চাক বসে। অর্থাৎ প্রাণীদের মধ্যকার বোঝাপড়াকে তাদের নিজেদের কাছে ছেড়ে দিতে পারলে মানুষেরই মঙ্গল।

যেদিন গুইসাপকে সত্যিকারি ভয় পেয়েছিলামঃ

গুইসাপ আমার কত পছন্দের একটা প্রাণী তা যারা আমার ওয়েব সাইটের নিয়মিত পাঠক তারা জানেন। কিন্ত এদিন এই গুইসাপ কে অন্য একটা গুইসাপের সাথে খালে আমি লড়াই করতে দেখি। খালের পানিতে ভালোই ঢেউ সৃষ্টি হয়েছিল। লড়াইয়ের পরেই সে আমাদের পুকুরে চলে আসে। ঐ লড়াই ছিল মূলত মেটিং গেমের অংশ। তখনই এই ছবিটা তোলা। আমার কাছে মনে হয়েছিল এর টেস্টোরনের জোড়ে আমাকেও কাছে পেলে কামড়ে দিতে পারে।

ফড়িং এর বৃষ্টিতে ভেজাঃ

ফড়িং কে আমি এক নাগারে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখেছি। ফড়িং অনেক শক্তিশালী এক প্রাণী। যতটা এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই তার থেকে বেশি মুগ্ধ হই এর টিকে থাকা দেখে। একটা ভিডিও করতেও সক্ষম হয়েছি যে প্রচন্ড ঝড়ের মাঝে কি করে ফড়িং নিজেকে পাতার সাথে আটকে রাখে। এ বছর ফড়িং এর সাথে আমার অনেক সময় কাটে। এ ছবিটা এক দুপুরে বৃষ্টির মাঝে তোলা। বৃষ্টি হলে সাধারণত অন্যান্য পোকামাকড় গুটিসুটি মারে। কিন্ত ফড়িং এর বেলায় ব্যাপকহারে সে জিনিস চোখে পড়েনি।

বর্ষনমুখর বিকেলে পেঁচা যখন বিরক্তঃ

আমাদের বাসার গাছগুলোতে কয়েকটি পেঁচা আছে। কিন্ত এদের দেখা পাওয়া ভার। একেতো লাজুক। দ্বিতীয়ত রাত ছাড়া এদের উপস্থিত টের পাওয়া ঢের কঠিন এক ব্যাপার। রাতেই এরা ডেকে থাকে সাধারণত। তখন যদি তাদের আসল লোকেশন বুঝা সম্ভব হয় তখনই দেখা পাওয়া সম্ভব। কিন্ত এই পেঁচাকে এক বিকেল বেলা জুবুথুবু হয়ে তেতুল গাছে বসে ভিজতে দেখব তা কল্পনাতেও আসে নি। মনে হচ্ছিল যেন, এক নাগাড়ে বৃষ্টি হওয়া সে মেনে নিতে পারছে না। সে বৃষ্টি নিয়ে কিছুটা বিরক্ত। কেননা বর্ষণমুখর সন্ধ্যা মানে গর্ত হতে ইদুরের বাহিরে না আসা।

 

ফড়িং আসে কোথা হতে ?

আমার বাসার লোকদের মতে ফড়িং আজীবন ফড়িঙই থাকে । অর্থাৎ ফড়িং এর জন্ম ফড়িং হয়েই। যেমনঃ প্রজাপতির জন্ম শুঁয়োপোকা থেকে। বা বিভিন্ন পোকার জন্ম যে লার্ভা স্টেজ থেকে হলেও আমার পরিবারের লোকরা জানত ফড়িং চিরজীবনই ফড়িং। কিন্ত আমি তাদেরকে দেখাই ফড়িং কি করে নিম্ফ থেকে নিজেকে পরিবর্তন করে খুব সুন্দর ফড়িং এ পরিণত করে। আকাশে উড়ার আগ পর্যন্ত ফড়িং যে পুকুরের পানিতে রাজত্ব করে সে ব্যাপারে কজনরই বা জানা আছে। আমার দাদুর (দাদি) একশ বছরের জ্ঞান কে এ ছবি দ্বারা ভেঙ্গে দেই। এবার অসংখ্য রাতের সময় কাটে এই ফড়িং এর পরিবর্তন দেখে। সবাইকে ডাক দিয়ে দিয়ে দেখাই। যে ফড়িং কিভাবে ফড়িং হয়। এ বছরে ফড়িং এর ফড়িং হওয়া আমার ডায়েরীর এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।

গুইসাপের ভাতঘুমঃ

এক শুক্রবার ভাত খেয়ে ছাদে গিয়ে দেখি এই সুন্দরী খুব সুন্দর হিজল গাছের মগডালে উঠে বিশ্রাম নিচ্ছেন। আমি আমার ঘরের বাচ্চাদের সঙ্গে সঙ্গে ডেকে এনে একে দেখাই। দেখ , তোমরা তো দুপুরের খাওয়ার পরে কোন বিশ্রাম ছাড়াই খেলাধুলায় নেমে গিয়েছ। আর এ দেখ কত সুন্দর দুপুরটাকে বিশ্রাম নিয়ে কাজে লাগাচ্ছে !

 

এটা কি ডায়মন্ডের কিছুঃ

যে সব শুঁয়োপোকাদের গায়ে কাটা থাকে তাদের আমরা ছোটবেলায় বিছে বলে চিনতাম। কিন্ত কমন ব্রাউন বাটারফ্লাইয়ের শুঁয়োপোকা এত সুন্দর যে একে আমার বিছে হিসেবে পরিচয় দিতে কষ্ট হচ্ছিল। মনে হয় যেন একটা হীরের আংটি। চারিদিক হতে যেন ডায়মন্ড ঠিকরে বের হচ্ছে। এমন সুন্দর জিনিসের দেখা কোথায় পাবেন জানেন ? আম গাছে। এখনই আপনার বাসার আমাগাছের পাতাগুলো দেখে আসতে পারেন। কিন্ত দুঃখের বিষয় হল এদের ক্যামোফ্লেজ এতটাই কঠিন যে দিনের সূর্যের কড়কড়া আলোতে এদের খুঁজে বিশেষ একটা সুবিধা করতে পারবেন না। তবে রাতে পাওয়ার সম্ভবনা দিতে পারে। এই কমন ব্রাউনের আশ্চর্য বিষয় হল বিশেষ করে আমাদের বাসাতে যেগুলো আছে এরা ক্যাটারপিলার অবস্থায় আম গাছের পাতা খায়। আর প্রজাপতি হওয়ার পর আমাদের পেয়ারা গাছের পেয়ারা খায়। বিশ্বাস হচ্ছে না ? সে ছবিও যে ডায়েরীর অন্যকোন পাতায় তুলে রেখেছি।

 

 

মাছরাঙ্গার রাজকীয়তাঃ

আমাদের পুকুরে যে কয়টা মাছরাঙ্গা আসে এদের মধ্যে ইনি হচ্ছেন সবথেকে বড়। তার শরিরে যে রঙ দেখতে পাচ্ছেন তা আসলে কিন্ত নীল নয়। এটা নীলের এক রূপ। সে কি করে ? তাহলে তা নিয়ে বিস্তারিত লিখতে হবে। সেই গল্প আরেকদিন হবে। কিন্ত আপাতত একটা বিষয় বলে যাচ্ছি। মাছরাঙ্গা পাখি খুব চুপেসারে এসে গাছের ডালে বসে। কিন্ত যাওয়ার সময় তার খড়খড়া গলায় ডাক দিতে দিতে প্রস্থান করে। এই ডাকের মর্ম আমি আদৌ উদ্ধার করতে পারি নি। এটা যেন এরকম যে আমরা বিদায় নেওয়ার সময় কর্তা ব্যক্তিদের থেকে সালাম বা আসি এবার এগুলো বলে যেরকম বিদায় নিয়ে থাকি মাছরাঙ্গার ব্যাপারটাও কি ওরকম কিছু ?

 

আমাদের মনিটরের বড় হয়ে উঠাঃ

মনিটর কে নিয়ে নতুন আর কি লিখব। তাকে নিয়ে যা বলার “অক্টোপাস মাই টিচারএর যে অনুভূতি আমাকে গ্রহণ করেসংক্রান্ত প্রবন্ধে বিস্তারিত লিখেছি। ২০২১ এর জানুয়ারি থেকে একে ফলো করা শুরু। দেখতে দেখতে ডিসেম্বর চলে আসল। আমিও চাই ও বেচে থাকুক। এবং ওর থেকেই আরো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আসুক।

 

বাদ যাবে না প্রোটিনের একটি দানাওঃ

এই যে মৌসুমী বৃষ্টির পরে এত সুন্দর সুন্দর মাশরুম হয় , আসলে এদের কাজ সম্পর্কে কি কখনো ভেবে দেখেছেন ? এরা মূলত প্রকৃতির ঐ সমস্ত পুষ্টিকণা কে ভেঙ্গে উদ্ভিদের জন্য গ্রহনযোগ্য তৈরি করে যা উদ্ভিদ স্বাভাবিক অবস্থায় গ্রহণ করতে সক্ষম নয়। অর্থাৎ কোন পুষ্টিকণার অপচয় হয় না প্রকৃতিতে। মাশরুম কি ? সোজা কথায় ছত্রাক। আমরা সাধারণত মাশরুমের উপরের ফ্রুটবডি দেখেই খুশি। কিন্ত এর মূল কাজ হয় নিচে। তার নিজস্ব নেটওয়ার্ক তৈরি করে। অনেকটা মাকড়সার জালের মত। সেই নেটওয়ার্ক দিয়ে আবার একটার সাথে আরেকটা ইন্টারকানেক্টেড থাকে। এভাবে একে অপরের সাথে খাদ্য, তথ্য, সুখ, দুঃখ সব তারা শেয়ার করে।

 

শালিক যখন অর্কিডের সৌন্দর্যে মাতোয়ারাঃ

আমাদের বাসার পিছনে খালের ওপারে একটা বাশবাগান আছে। সেই বাশ বাগান জুড়ে এই অর্কিডের বসতি। বছরে দুবার ফুল দেয়। যখন ফুল হয় তখন সারা বাশবাগান সাদা হয়ে যায়। আর ঐ ফুল যখন খালের পানিতে পড়ে তখন তা অনেক সুন্দর পরিবেশের সৃষ্টি করে। শালিক বোধহয় তার সঙ্গীদের মাঝে এই সৌন্দর্যের কথাই ঘোষণা করছিল ।

 

 

ফিঙ্গে এখন রাতের পাখিঃ

শহুরে পরিবেশ যে কয়েকটা পাখির অভ্যাসগত আচরণে পরিবর্তন এনেছে তাদের মধ্যে ফিঙ্গে অন্যতম। বিশ্বাস হয় না ? আমাদের মাদারীপুরে আসুন। বাসস্ট্যান্ড হতে শুরু করে মূল রাস্তার প্রায় প্রত্যেকটা ল্যাম্পপোস্ট কোন না কোন ফিঙ্গের দখলে। আচ্ছা তাহলে এরা ঘুমায় কখন ? আরে এটাইতো রিসার্চের বিষয়।

পুরান ঘরের বাসিন্দারাঃ

আমাদের পুরান ঘরটাতে এখন আর কেউ থাকে না। তবে না থাকাটাই মাকড়সাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশের সৃষ্টি করে দিয়েছে। অবশ্য এই ড্যাডি লং লেগ স্পাইডার আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারব আমার এই আর্টিকেল যতজন পড়ছেন সবার বাসারই কোন না কোন কোনায় এর অবস্থান রয়েছে। যাই হোক, টিনের ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে। আর তা মাকড়সার বাসাকে আন্দোলিত করছে। আর সেখানে তার বাচ্চারা একটু একটু করে নড়েচড়ে উঠছে।

 

হান্টসম্যানের ভালোবাসাঃ

একুশের বড় একটা সময় কাটে আমার হান্টসম্যান স্পাইডারের পিছনে। এমনকি একে নিয়ে লেখার আর্টিকেলটা এত বড় হয়ে যাচ্ছে দিন দিন যে তা বইয়ের সাইজ হয়ে গেলে আশ্চর্য হব না। এটা এক অসাধারণ মূহুর্ত ছিল। হান্টসম্যান তার ডিমের থলে থেকে তার বাচ্চাদের বের করে দিচ্ছে। এরকমভাবে আলতোভাবে চাপ দিচ্ছে যেন একটা বাচ্চাও থলেতে অবশিষ্ট না থাকে। যদিও বাচ্চারা বড় হওয়াতে দুদিন আগ থেকেই থলে থেকে বাচ্চারা বের হতে আরম্ভ করে। কিন্ত শেষ দায়িত্বতা তুলে নেয় মা মাকড়সা। সে আদরের সাথে সবাইকে বের করে দিয়ে ডিমের থলেটা ছেড়ে এক বিশাল দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যায়।

আঁচিল ঘরে কেনঃ

একদিন সকালে দরজার কোণাতে দেখলাম কি যেন লড়ছে। কাছে গিয়ে আমি দেখলাম টিকটিকির সমান এতটুকু আঁচিল পিপড়ে খাচ্ছে। এটা এতই ছোট যে একে আইডেন্টিফাই করতে পারলাম না যে এটা কোন প্রজাতির। ধরতে যাব ফুরুত করে দরজা এবং চৌকাঠের মাঝে যেখান থেকে পিপড়ে বেরোচ্ছিল সেখানে গিয়ে আশ্রয় নিল অতি দ্রুততার সাথে।

 

প্রথম গেছোব্যাঙের সাথে দেখাঃ

গেছোব্যাং বিভিন্ন এলাকাতে খুব কমন হলেও আমাদের বাসার এরিয়াতে এই ব্যাং আগে কখনো দেখি নি। এটা দেখে যারপরনাই আশ্চর্য হয়েছি। এর পা এর বসার ভঙ্গি সবই তাকিয়ে থাকার মত। এটা Common Tree frog ( Polypedates leucomystax ) । এছাড়াও আমি সাধারণভাবে জানতাম আমার বাসার এরিয়ার মধ্যে শুধুমাত্র দুই প্রজাতির ব্যাং রয়েছে । কিন্ত এবার আরো তিনটি প্রজাতি চিহ্নিত করি। মোট ছয় প্রজাতির ব্যাং বাসার এরিয়ার মাঝে চিহ্নিত করি।

প্রজাপতির মেটিং ড্যান্সঃ

এবছর প্রাণীদের যে বিষয়গুলো আমার স্মৃতিতে আচড় কেটেছে তার মধ্যে অন্যতম হল বসন্তের উষ্ণ রোদে আমাদের পুকুরের আশপাশজুড়ে প্রজাপতিদের মেটিং ড্যান্স। এর ইংরেজি নাম Red Spot Jezebel (Delias descombesi) । এই প্রজাপতির আশ্চর্য বিষয় হল এরা সাধারণত অন্যকোন পাখি দ্বারা শিকার হয় না। এর এক কারণ হল এদের স্বাদ খুব তিক্ত। যে কারণে এরা অনেকটা দুশ্চিন্তামুক্ত হয়েই তাদের মেটিং ড্যান্স করতে পারে। এরকম অনেক বড় এরিয়া নিয়ে ড্যান্স সাধারণত প্রজাপতিদের বেলায় পাওয়া যায় না। বেশিরভাগ প্রজাপতিই নিজেকে লুকানোর চেষ্টায় ব্যস্ত থাকে। কিন্ত এর ব্যাপারটা কিছুটা হলেও ভিন্ন।

 

উইপোকার নতুন বসতির জন্য গমনঃ

উইপোকার দল গত বছরে আমাদের বাসায় তিনবার এসে জড়ো হয়। ছোটবেলাতে এরকম এসে জড়ো হত। কিন্ত কেন এ কাজটা উইপোকারা করে সেটা আমার জানা ছিল না। একটা ধারণা ছিল যে এরা যখন মারা যায় তখনই এদের পাখনা গজায়। কিন্ত বিষয়টি মোটেও এরকম নয়। আসলে প্রতিটা উইয়ের ডিবি নিয়ন্ত্রিত হয় একজন রানী উইপোকার দ্বারা। এই ডিবিগুলোতে যখন উইয়ের সংখ্যা বেড়ে যায় তখন রানী পোকার আদেশে এরা বেরিয়ে আসে নতুন বসত গড়ার জন্য। এই প্রত্যেকটা উই একেকটা ভবিষ্যৎ রাজা বা রানী। কিন্ত আমাদের বাসাতে জড়ো হয় কেন ? এখন পর্যন্ত এর সম্ভাব্য উত্তর এরা লাইট পলুশনের শিকার। সম্ভবত এরা চাঁদ কিংবা সূর্যের আলো কে কেন্দ্র করে এরা নতুন জায়গাতে গমন করে কিন্ত পথিমধ্যে আমাদের বাসার আলো দেখে তাদের যাত্রা বাঁধাগ্রস্ত হয়। এটা এখন পর্যন্ত হাইপোথিসিস। যা প্রতিষ্ঠিত করতে হলে ব্যাপক গবেষণা করতে হবে।

 

বেবি বুলবুলিঃ

একদিন দুপুরে আমি আর আমার ছেলে বাসার সামনের মাঠ দিয়ে হাটছি। হঠাৎ করে একজোড়া বাচ্চা পাখি কোন জায়গা থেকে যেন উড়ে এসে খুব ডাকাডাকি শুরু করে দিল। কাছে গিয়ে দেখি এর গড়ন বুলবুলির মত। কিন্ত একেবারে বেবি বুলবুলি। সবেমাত্র ঘর ত্যাগ করেছে এরক্ম পাখি। এখনো এর লাল পালক হয় নি।

 

কুমারীপোকার বসতবাড়িঃ

বাংলাদেশের অনেক জাগাতেই এই বোলতাকে কুমারী পোকা হিসেবে ডাকা হয়। এটা কিন্ত এক প্রকার বোলতা। মাটি দিয়ে বোলতা ঘর বানায়। তবে বড় বোলতাদের মত চাক বানিয়ে একত্র একসাথে অনেকে মিলে থাকে না। এরা থাকে একা একা। একা একাই ঘর বানায়। এরা মূলত অন্য জীবের উপর বংশবৃদ্ধি করে। এই পটার ওয়াস্প বা বোলতা মূলত মাকড়সাদের শিকার করার জন্য টার্গেট বানায়। তবে তা খাওয়ার জন্য নয়। মাকড়সার শরীরে ঠিক হুল ফুটিয়ে ঠিক ঐ পরিমাণ বিষ দেয় যতটুকু বিষে মাকড়সা প্যারালাইজড হয়ে যাবে। তারপর সেই মাকড়সার দেহে নিজের লার্ভা ছেড়ে দেয়। সেই লার্ভাগুলো মাকড়সাকে খেয়ে খেয়ে বড় হতে থাকে। পটার ওয়াস্পের বাসা ভাঙলে মাকড়সা পাওয়া যাবে নিঃসন্দেহে।

 

টিকটিকির কারিশমা (বোনাস পাতা)ঃ

টিকটিকি পোকা খায় এটা নতুন কিছু নয়। কিন্ত টিকটিকি যে ছদ্মাবেশ ধারণেও পটু এটা অজানা ছিল। টিকটিকিও যেকোন পরিবেশে থাকলে কিছুদিনের মধ্যেই তার আশপাশের বর্ণ ধারণ করা শুরু করে। এগুলো কিন্ত আমাদের ঘরের সাধারণ টিকটিকিই। কিন্ত বাহিরের আশপাশের পরিবেশের সাথে নিজের চামড়ার রঙ ধারণ করতে পারটাও এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ।

এবছর আমার ডায়ারিতে এরকম অসংখ্য পাতা সংযুক্ত হয়েছে। সব পাতা যোগ করলে তা এক বিশাল বই হয়ে যাবে। তার থেকে একুশ সালের বিদায় উপলক্ষে একুশটি পাতাই আপাতত যোগ করে শেষ করছি। 

৪ thoughts on “আমার ডায়ারির একুশ পাতা

  1. সাব্বির
    সাব্বির says:

    আলহামদুলিল্লাহ। সুন্দর।

    1. সাওয়াবুল্লাহ্ হক

      জাযাকাল্লাহু খায়রান।

  2. Omar Faruk

    It’s a tremendous thing that you made.
    Literally it’s give me joy and cheer. I just thinking about your passion.
    I say again, literally it’s a work which is very important to do for our environment.
    I guess you will get a award if you submit it in international forum.

    May Allah(SWT) give you the opportunity to work with wildlife as well as human life

    1. সাওয়াবুল্লাহ্ হক

      Thanks for your precious comment. Pray for me.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *